যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি: কে জিতল?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ জটিল আকার ধারণ করেছিল। তবে দেশগুলোর যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আসবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।   ছবি: আরটিএনএন

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধবিরতিকে বিজয় হিসেবে দাবি করেছে; তবে বাস্তব পরিস্থিতি দেখলে পরিস্থিতি আরও জটিল বলেই মনে হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো—প্রতিটি পক্ষের লক্ষ্য ও জয়ের কৌশল একেবারেই আলাদা। আরও জটিল বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধের বড় খরচগুলোর অনেকটাই যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে—বিশেষ করে তাদের মিত্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতি। তাই এই যুদ্ধবিরতির ফলে কে বিজয়ী হয়েছে তা এখনই নির্ধারণ করা আসলেই কঠিন।

যুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এগিয়ে ছিল তা অনেকেই বলছেন। কারণ যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়েই ইরানের হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছিল, তাদের শীর্ষ নেতাদের নিহত করা হয়েছিল এবং নৌবাহিনী ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ মাত্র ৩৮ দিনে তাদের প্রধান সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে।

অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের মূল লক্ষ্য—সরকার টিকিয়ে রাখা, পারমাণবিক কর্মসূচি ধরে রাখা এবং মিত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা—এগুলো তারা এখনও পুরোপুরি হারায়নি। তারা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করেছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে। সামরিকভাবে দুর্বল হলেও কৌশলগতভাবে ইরান কিছুটা সফল হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে পারে। হোয়াইট হাউসের মতে, হরমুজ প্রণালির পুনরায় খোলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুনরায় স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে। তবে ইসরায়েলের অবস্থান কিছুটা অস্পষ্ট। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ যুদ্ধবিরতিকে ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে দেখছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুরকে ব্যর্থ মনে করছেন। লেবানন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল এখনও আগের মতো হামলা চালাচ্ছে।

যুদ্ধের ফলে নিহতের সংখ্যা বহু দেশে প্রকট। ইরানে নিহত ১ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার ৬৩৬ জন, লেবাননে ১ হাজার ৫৩০ জন, ইরাকে ১১৭ জন এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রেরও সৈনিকদের প্রাণহানি ঘটেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলের দাম বেড়ে গেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার অন্যান্য অঞ্চলেও সামরিক প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই বলা যায়, সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এগিয়ে থাকলেও কৌশলগত লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ইরান যুদ্ধকে ব্যয়বহুল করে তুলতে এবং বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধবিরতি দুপক্ষই নিজেদের বিজয় দাবি করলেও বাস্তবে এটি সাময়িক সমঝোতার অংশ, যা ভবিষ্যতে আরও আলোচনার দরজা খুলেছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিকভাবে প্রাধান্য পেয়েছে, কিন্তু কৌশলগত ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানও অনেকটা সাফল্য অর্জন করেছে। তাই এখনো বলা যায় সম্ভব নয়, কে প্রকৃতভাবে এ যুদ্ধে বিজয়ী হলো। যুদ্ধবিরতি হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য শান্তি এনেছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য আরও কূটনৈতিক চাপ ও আলোচনা প্রয়োজন।