মধ্যপ্রাচ্য, রেমিট্যান্স, অর্থনীতি, বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য প্রবাসী আয়ে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।   ছবি: আল-জাজিরা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, গ্রামীণ অর্থনীতির চাঙাভাব এবং দারিদ্র্য হ্রাস—সব ক্ষেত্রেই এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের শ্রমবাজারের মূল গন্তব্য। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে লাখো বাংলাদেশি কর্মরত। ফলে এ অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে। বর্তমানে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়বে—এমন আশঙ্কাই করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে আশার দিকও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী অবস্থানে আছে। বিশেষ করে রমজান ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে মার্চ মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, যা অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, সংকটকালেও প্রবাসীরা দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা বজায় রাখেন।

কিন্তু এই প্রবণতা কতদিন স্থায়ী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, বিশেষ করে নির্মাণ ও সেবা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। কাজ হারানো, বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়া বা বাধ্যতামূলকভাবে দেশে ফিরে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি করে—একদিকে বাড়ে আমদানি ব্যয়, অন্যদিকে কমে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের সম্ভাবনা। ফলে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ইতিহাস বলছে, এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও বহু প্রবাসী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও তখন কিছু সময়ের জন্য রেমিট্যান্স বেড়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা কমে যায় এবং শ্রমবাজারে চাপ সৃষ্টি হয়। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে একই ধরনের চক্র আবারও দেখা যেতে পারে।

তবে সব বিশ্লেষণই যে নেতিবাচক, তা নয়। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রবাসীরা সাধারণত যেকোনো পরিস্থিতিতেই পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানোর চেষ্টা করেন। ফলে স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের ধস নামার সম্ভাবনা কম। কিন্তু নতুন শ্রমিক প্রেরণ কমে গেলে এবং বিদ্যমান কর্মীদের চাকরির অনিশ্চয়তা বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রবাসীদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এখনো রেমিট্যান্সে বড় ধাক্কা দেয়নি, তবে ঝুঁকির ইঙ্গিত স্পষ্ট। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ চাপে পড়তে পারে। তাই এখনই সতর্কতা ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি।