অনলাইন, তেল
অনলাইন ক্লাস বা ব্লেন্ডেড লার্নিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।   ছবি: সংগৃহীত

আমাদের শাসকশ্রেণী খালি সুযোগের সন্ধানে থাকেন। কিভাবে দেশটাকে অচল করা যায়? এক ফ্যাসিবাদী চরিত্র পালিয়েছে, তো আরেক নব্যবাদ জন্ম নিতে শুরু করেছে। জাতির দুর্ভাগ্য—চক্রাকারে জাতি একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ যেন গোলকধাঁধা; বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। আসলে কি তাই?

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথরুদ্ধ করে দিয়ে এখন অন্যদিকে মোড় ঘোরানো নয় কি? কেননা, জুলাই ইস্যু যাতে ধামাচাপা পড়ে যায়—এই জন্য কি অনলাইন-অফলাইন ক্লাস বিতর্ক তোলা হচ্ছে? তেলের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অনলাইন যুক্তি কী—তা বুঝলাম না। কোভিডের সময় বাচ্চাদের অনলাইন ক্লাস মোটেই সুখকর ছিল না। এসব বাচ্চারা লেখাপড়া করার চেয়ে ডিভাইসে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে। শিক্ষার্থী লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হওয়ার পরিবর্তে ক্লাসে যুক্ত হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটিং করতে ব্যস্ত থাকে। ফলে শিক্ষক বুঝতে পারেন না শিক্ষার্থী মনোযোগী কিনা। আবার ধরতে পারলেও করার কিছু থাকে না। কেননা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আই কন্টাক্ট নেই, নেই ভাব আদান-প্রদানের সংযোগ। এ এক অদ্ভুত শিক্ষা!

দেশের তথা আন্তর্জাতিক বিশ্ব পরিস্থিতি আমাদের জীবনযাপনের পদ্ধতি পাল্টে দিতে বাধ্য করছে—মানলাম। তাই বলে শিক্ষা ক্ষেত্রে কেন? তেল সংকটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ বাঁচাতে অফিসের কর্মঘণ্টা কমানো যায়। বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি অফিস—এমনকি মন্ত্রী, উপমন্ত্রী—সবাই অনলাইনে কিছু অফিসিয়াল কার্যক্রম চালাতে পারেন। পাবলিক বাস সার্ভিস চালু করে প্রাইভেট কার সীমিত করা যেতে পারে। মার্কেটসমূহ প্রয়োজনে সন্ধ্যার পর বন্ধ করা যায়। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় হবে।

আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে হওয়া উচিত ছিল—এলাকানির্ভর। যে যে এলাকায় বসবাস করে, সে এলাকার প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করবে। এতে করে প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানসম্মতভাবে গড়ে উঠতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—দূর থেকে শিক্ষার্থীদের আসতে হয়। একই প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ভালো করছে, অন্যদিকে তারা বিভিন্ন শাখা খুলে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে। এটা তাদের ভালো দিক বলা যায়। তবে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানই শুধু ভালো করবে, বাকিরা করবে না—এর পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে কিনা ভাবতে হবে।

যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভালো করছে, তাদের সব ধরনের সক্ষমতা আছে। তারা অনলাইন, অফলাইন কিংবা একই সঙ্গে উভয় ক্লাস চালানোর মতো সক্ষমতা রাখে। তাই বলে কি কিছু প্রতিষ্ঠানই সারাদেশের মানদণ্ড হতে পারে? শিক্ষাকে পণ্য নয়, যুগোপযোগী সেবা ভাবতে হবে। শিক্ষার্থী জাতির ভবিষ্যৎ। যুদ্ধ, বৈশ্বিক সংকট, সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক ও অর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট—সবকিছু সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হয়। প্রয়োজনে যুদ্ধের মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও পড়তে হতে পারে। তাই শারীরিক সক্ষমতা শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হয়। এজন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও খেলাধুলা নিশ্চিত করা। এগুলো কি অনলাইনে সম্ভব? প্রতিদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসার মাধ্যমে যে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে, তা কি জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় অনলাইন শিক্ষার বিকল্প হতে পারে?

হ্যাঁ, সাময়িক সমস্যার সমাধান হতে পারে। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতি শিক্ষার্থীদের হবে—সেটা কীভাবে সমাধান হবে? কোভিডকালীন অভিজ্ঞতা আমাদের সুখকর নয়।

এ ব্যাপারে কে কী ভাবছেন

শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘অনলাইন ও স্বশরীরে’—দুই পদ্ধতিতে পাঠদানের এই উদ্যোগ আদর্শ সমাধান নয়। তারা বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি ভাবতে বলছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এক দিন পরপর স্বশরীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে ক্লাস করা ভালো সিদ্ধান্ত—এমন মন্তব্য করে সরকারি আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, “এটা ঠিক, কোভিডকালীন অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়, যদিও তখন অনলাইন ক্লাসের কোনো বিকল্প ছিল না। এখনো জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবে চালু রাখতে পারলে খুবই ভালো। যদি তা না করা যায়, তাহলে বিকল্প কী হতে পারে, তা নিয়ে আরও ভাবার সুযোগ রয়েছে।”

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর রেহানা সুলতানা বলেন,
“বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকট এখন বাস্তব সমস্যা। তবে অনলাইন ক্লাসই কি তার একমাত্র সমাধান? অনলাইন শিক্ষা কি সত্যিই শিক্ষা দিচ্ছে, নাকি একটি প্রজন্মকে আরও বেশি ডিভাইস-নির্ভর করে তুলছে? জ্বালানি সংকট সাময়িক, কিন্তু ডিভাইস-আসক্তির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। এটা আমাদের সবাইকে ভোগাবে।”

অভিভাবকদের অভিমত

অনলাইন পাঠদানের খবর আসার পর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন রাজধানীর ভাটারা এলাকার শিক্ষার্থী শাহদাৎ হোসেন ফাহাদের বাবা মো. মোহন।

ফাহাদ খিলবাড়ীরটেক ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা ভাটারা এলাকার একটি বাড়িতে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত।

মোহন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছিলেন, ‘বাসায় তো ডিভাইস নেই। অনলাইন ক্লাস করতে বললে একটু অসুবিধায় পড়তে হবে। এ মুহূর্তে যে নতুন একটা স্মার্টফোন কিনব, সে পরিস্থিতিও নেই।’ (সূত্র: bdnews24.com)

এই অভিভাবকের মতো গ্রামাঞ্চল, শহরের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির অভিভাবকরাও মনে করেন—প্রয়োজনে ছুটি বাড়িয়ে স্বশরীরে ক্লাস নেওয়া হোক। তাদের অন্যতম যুক্তি—ক্লাসে ৩০/৫০ জন শিক্ষার্থী থাকলে ফ্যান ঘোরে ২/৩টি, আর ৩০/৫০ জন শিক্ষার্থী যখন বাসায় অনলাইনে ক্লাস করবে, তখন ফ্যান চলবে ৩০/৫০টি। কোনো কোনো অভিভাবকের মতে, একাধিক সন্তানের জন্য একাধিক ডিভাইস ও আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার জন্য ক্লাসরুমের ক্লাস যে আনন্দ ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করে, তা অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব নয়। বর্তমানে পাশ্চাত্যের অনেক শিক্ষাবিদ উন্মুক্ত পরিবেশে—এমনকি গাছতলায়ও—শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর পক্ষে। তাহলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে অনলাইন শিক্ষা কি তেল সংকট মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সীমিত করে গভীর সংকটে ফেলছে না—তা ভাবার বিষয়।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আকাশের মতো উদার, জমিনের মতো দৃঢ়চেতা হয়ে বড় হবে—বিশ্ব নিখিল থেকে শিক্ষা নেবে, দৃষ্টি প্রসারিত করবে। অথচ তাকে ডিভাইস নামক চারকোনা ফ্রেমে বন্দি করে শেখাতে চাচ্ছি—যদিও তা সাময়িক। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে দেখা গেছে, বিশেষ করে কোভিডকালীন অভিজ্ঞতা বলছে—অনলাইন শিক্ষায় কিছু সুবিধা থাকলেও অসুবিধা বেশি। যন্ত্র কখনো মানুষের বিকল্প হতে পারে না। মানুষ যন্ত্র ব্যবহার করবে বিভিন্ন কার্যক্রমে, কিন্তু মানুষ গড়ার জন্য মানুষই লাগবে—এবং তা হতে হবে সরাসরি।

তাই তেল সংকট মোকাবেলায় অন্য কোনো বাণিজ্য যেন শিক্ষার্থীদের ধ্বংসের পাঁয়তারা না হয়—সরকার, সমাজ ও সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র সচেতন মহল মেনে নেবে না।