ইরান, ট্রাম্প, খামেনি, ইসরায়েল, গাজা
ফিলিস্তিনের গাজায় মানবেতর জীবন পার করছে মানুষ, চারিদিকে ধ্বংসস্তূপ।   ছবি: সংগৃহীত

আমি গাজায় অনেক মৃত্যু দেখেছি। সেগুলো স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না; ছিল নৃশংস ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কিন্তু ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় সমাহিত স্বাস্থ্যকর্মীদের লাশ খুঁড়ে বের করার সেই ভয়াবহ দৃশ্য আমার স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। গত বছর আমি ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী হিসেবে জাতিসংঘের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলাম। সে সময় দক্ষিণ গাজায় 'প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি' এবং সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারীরা নিখোঁজ হন। তারা নিহত হওয়ার পর এক সপ্তাহ পর্যন্ত আমরা জানতাম না তারা জীবিত না মৃত। প্রতিদিন আমরা তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী আমাদের পথ আটকে দেয়। আমরা দেখেছি রাস্তা অবরোধ করে রাখা হয়েছে এবং পালিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর সেনারা গুলি চালাচ্ছে।

৩০ মার্চ, আমি এবং আমার সহকর্মীরা রাফাহতে একটি গণকবরের সামনে দাঁড়াই। পাশেই ইসরায়েলি বাহিনীর গুঁড়িয়ে দেওয়া একটি অ্যাম্বুলেন্সের লাইটের আলোয় সেই জায়গাটি চিহ্নিত করা হয়েছিল। তারা যে স্বাস্থ্যকর্মী ছিলেন, তা ইসরায়েলি বাহিনীর না জানার কোনো কারণ ছিল না। তাদের অ্যাম্বুলেন্সের আলো জ্বলছিল, তাতে আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত 'রেড ক্রিসেন্ট' প্রতীক ছিল এবং তারা ইউনিফর্ম ও গ্লাভস পরা ছিলেন। কিন্তু তাতে কিছুই যায় আসেনি। তাদের হত্যা করা হয়েছে, কাউকে কাউকে খুব কাছ থেকে গুলি করে কার্যকর করা হয়েছে। ভিডিও ও অডিও রেকর্ডিংয়ের ফরেনসিক বিশ্লেষণে তাদের জীবনের শেষ মুহূর্তের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে।

তদন্তের পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গোলানি ব্রিগেডের ডেপুটি কমান্ডারকে কেবল 'অসম্পূর্ণ রিপোর্ট' জমা দেওয়ার দায়ে বরখাস্ত করে। অন্য এক কমান্ডারকে তিরস্কার করে একটি চিঠি দেওয়া হয়। ব্যস, এটুকুই! স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এমন গণহত্যার বিচার বলতে এটাই ছিল তাদের 'জবাবদিহিতা'।

এর আগেও রেড ক্রিসেন্টকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। ছয় বছরের শিশু হিন্দ রাজাবকে উদ্ধারের সময়ও একই ঘটনা ঘটে। হিন্দ একটি গাড়িতে তার পরিবারের সদস্যদের লাশের মাঝে আটকে ছিল, যে গাড়িটিতে ৩৩৫টি বুলেটের ছিদ্র ছিল। তাকে বাঁচাতে যাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের ইসরায়েলি সেনারা হত্যা করে, যদিও সেখানে যাওয়ার জন্য আগে থেকেই সেনাবাহিনীর সাথে সমন্বয় করা হয়েছিল।

ইসরায়েলি বাহিনীর সাথে সেই 'সমন্বয়' হিন্দ রাজাবের কাছে পৌঁছাতে চাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের বাঁচাতে পারেনি। অথচ রাফাহতে অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের হত্যার সপক্ষে ইসরায়েল যুক্তি দিয়েছিল যে, সেখানে কোনো 'সমন্বয়' ছিল না। সত্য হলো, তাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরই ইসরায়েল রাফাহ ছাড়ার নির্দেশ জারি করেছিল। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স যদি কোনো সামরিক অভিযানের এলাকায় ঢুকেও পড়ে, তবুও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু না করা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দায়িত্ব।

গাজায় এই সমন্বয় ব্যবস্থাকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আসলে ত্রাণ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। মানবিক সহায়তা কর্মীরা কেবল 'ডিফল্টভাবে' খুন হওয়া থেকে বাঁচতেই এই সমন্বয় ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। গাজায় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারটাই এখন আক্রমণের শিকার। কোনো এলাকা থেকে মানুষকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর সেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া হয়। হাসপাতালগুলোও রেহাই পায়নি। আমরা আল-শিফার ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে হেঁটেছি, যেখানে আঙিনায় লাশ পড়ে ছিল। আমরা নাসের ও ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতাল থেকে রোগীদের সরিয়েছি, যেখানে আইসিইউ বেডে মুমূর্ষু রোগীদের পাশে রাস্তার বিড়াল বসে ছিল এবং ইসরায়েলি সেনারা আমাদের অ্যাম্বুলেন্স থেকে একজন আহত ব্যক্তিকে নামিয়ে নিয়ে বিদ্রূপ করছিল।

আমার সহকর্মীরা এবং আমি দুই বছর কাটিয়েছি কেবল জ্বালানি, ওষুধ ও অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম পাওয়ার জন্য দরকষাকষি করে। আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে ইসরায়েলের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বেশি এমন দেশগুলোর চাপের পরই কেবল গাজায় প্রতিটি পণ্য প্রবেশ করতে পেরেছে।

২০২৫ সালে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন নিশ্চিত করেছে যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানত ত্রাণ আটকে দিলে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু হবে। আমি এটি নিশ্চিত করতে পারি কারণ আমি নিজেই তাদের এই কথা বলেছিলাম। ত্রাণের অপর্যাপ্ততা কোনো যান্ত্রিক সমস্যা ছিল না; এটি ছিল জেনেশুনে নেওয়া একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যখন আমরা ফিলিস্তিনিদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য মাসের পর মাস আলোচনা করেছি, তখন প্রতিদিন আমাদের সামনে প্রমাণ আসছিল যে—পরিকল্পনাটি আসলে তাদের মেরে ফেলার জন্য।

গণহত্যা ঠিক এমনই হয়। এটি কেবল নির্বিচারে হত্যা নয়; বরং একটি জাতির টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি স্তম্ভ—হাসপাতাল, পানি, খাবার, সিভিল রেজিস্ট্রি, পুলিশ এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া। এখানে বিমান হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার অর্থ হলো ধ্বংসস্তূপের নিচে ধুঁকে ধুঁকে মরা। ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে যাওয়ার অর্থ হলো অ্যাম্বুলেন্সের অনুমতির অপেক্ষায় রক্তক্ষরণে মারা যাওয়া। আহত হয়ে বেঁচে থাকার অর্থ হলো এমন এক হাসপাতালে পৌঁছানো যা নিজেই ধ্বংসস্তূপ। আর হাসপাতাল থেকে বেঁচে ফেরার অর্থ হলো এমন এক তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া যা বৃষ্টিটুকুও আটকাতে পারে না।

আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বেশিরভাগ সময় আমি স্বাস্থ্যসেবার ওপর হামলাকে 'স্বাভাবিক' হতে দেখেছি। 'ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস'-এর সাথে ১৪ বছর কাজ করার সময় আমি অনেক যুদ্ধ দেখেছি। ২০১৫ সালে আফগানিস্তানের কুন্দুজে মার্কিন হামলায় ৪২ জন নিহত হয়েছিলেন—রোগীরা বিছানায় পুড়ে মরেছিলেন, কর্মীরা আকাশ থেকে ছোড়া গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র সেটাকে 'ভুল' বলেছিল। কিন্তু সেই তথাকথিত 'ভুল' করার আইনি পরিবেশটি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যার অন্যতম কারিগর ছিল ইসরায়েল।

গাজা হলো সেই ইতিহাসের চূড়ান্ত পরিণতি। এই নীতি শুধু গাজাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২২২ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। চলতি বছর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দক্ষিণ লেবাননে চিকিৎসা স্থাপনা ও অ্যাম্বুলেন্সে অন্তত ১২৮টি হামলা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সেখানে ৫১ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। গত ১৩ মার্চ বুর্জ কালাউইয়াহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বোমা হামলায় ১২ জন চিকিৎসক ও নার্স নিহত হন। অর্থাৎ, 'গাজা ডকট্রিন' এখন লেবাননেও পৌঁছে গেছে।

এই ধারাটি এখন স্পষ্ট এবং অনস্বীকার্য। কিন্তু কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় এই বিচারহীনতা হত্যার মেশিনকে আরও শক্তিশালী করছে। প্রতিটি দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে এই নজির আরও জোরালো হচ্ছে—আর এর ফলে সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষ আজ আরও বেশি নিরাপত্তাহীন।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই