আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-১১ (রামপুরা, বাড্ডা, ভাটারা) এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, অন্যদিকে এই আসনের পরিচিত মুখ ও বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুম। তবে ভোটের লড়াইয়ে প্রচার-প্রচারণায় নাহিদ ইসলামের ‘নীরবতা’ এবং বিএনপির ‘সক্রিয়তা’ নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।
ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে জমা পড়া মনোনয়নপত্রের যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে। যাচাই শেষে কোন হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়ন বহাল থাকছে আর কারটি বাতিল হচ্ছে, এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে নানা আলোচনা। বৈধ প্রার্থীরা যখন ভোটারদের কাছে ছুটছেন, তখন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা ব্যস্ত আপিল ও আইনি লড়াইয়ে।
ঢাকা-১১ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. এম. এ. কাইয়ুম। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে উভয় প্রার্থীর মনোনয়নই বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সম্প্রতি এনসিপি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সমঝোতায় গেলে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আতিকুর রহমান ঢাকা-১১ আসন থেকে সরে দাঁড়িয়ে নাহিদ ইসলামকে শুভকামনা জানান।
জাতীয় সংসদের ১৮৪ নম্বর এই আসনে ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির অবস্থান শক্ত। বিভিন্ন সময়ে অন্তত পাঁচবার এই আসনে জয় পেয়েছে দলটি। তাই শক্ত ঘাঁটিতে জামায়াত-এনসিপি জোট কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নিয়েই চলছে আলোচনা।
বাড্ডা থানার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কাওসার আলম নিয়মিত স্থানীয় রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, কে কাকে ভোট দেবে, তা এখনই বলা কঠিন। কাইয়ুম সাহেবের সমর্থকরা বরাবরই প্রকাশ্যে ছিল। আতিক সাহেবের ভোটাররা ছিল অনেকটা আন্ডারগ্রাউন্ড। এখন নাহিদ ইসলাম কতটা জামায়াতের সমর্থন পান আর এনসিপি নিজে কতটা মাঠে সক্রিয় হতে পারে, সেটাই মূল বিষয়।
তিনি বলেন, নাহিদ ইসলামের পরিচিতি থাকলেও এলাকায় ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইন তেমন চোখে পড়েনি। সবমিলিয়ে এই মুহূর্তে সার্বিকভাবে কাইয়ুম সাহেব এগিয়ে আছেন।
একই আসনের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও চা দোকানদার মো. ইদ্রিস আলী বলেন, আমি এখনো নাহিদ ইসলাম বা আতিকুর রহমান কাউকেই এলাকায় দেখিনি। তবে এম এ কাইয়ুম কমিশনার থাকাকালে অনেকবার দেখেছি। আমার মনে হয় এই আসনে বিএনপির অবস্থানই সবচেয়ে শক্ত।
মধ্য বাড্ডার সবজি বিক্রেতা আব্দুস সাত্তার জানান, এখনো কোনো প্রার্থী তার কাছে ভোট চাইতে আসেননি। এমনকি নাহিদ ইসলাম যে ঢাকা-১১ থেকে নির্বাচন করছেন, সেটিও তিনি জানতেন না।
তবে ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ ওলিউল্লাহ বলেন, আতিকুর রহমান থাকলে কাইয়ুম সাহেবের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো। এখন নাহিদ কিছু ভোট পেলেও জামায়াতের কর্মীরা আগের মতো সক্রিয় হবে কিনা, সেটাই প্রশ্ন।
২১ নম্বর ওয়ার্ডের তরুণ ভোটার মো. ফয়সাল বলেন, আমি তরুণ হিসেবে নাহিদ ইসলামকে পছন্দ করি। জুলাই আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব কারণেই আমি তাকে ভোট দেব। জামায়াত এই আসনে প্রার্থী দিলে আমি জামায়াতকেই ভোট দিতাম। জামায়াতের এখানে বড় ভোটব্যাংক আছে, যা অনেকেই বুঝতে পারে না।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতের ভোটব্যাংকের বড় অংশ নারী ভোটার। কৌশলগতভাবে নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে দলটি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
অন্যদিকে বিএনপি সমর্থক ওলিউর রহমান দিপু বলেন, আমাদের বাড়িতেই ২২ জন ভোটার আছে, সবাই এম এ কাইয়ুমকে ভোট দেবে। জামায়াতের ভোট সর্বোচ্চ ১০ হাজার। এনসিপির ছাত্রদের অনেকেরই এখনো ভোটার হয়নি। এই আসনে কাইয়ুম সাহেব বিপুল ভোটে জিতবেন।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাহিদ ইসলাম এখনো নিজ আসনে দৃশ্যমান কোনো নির্বাচনী প্রচারণায় নামেননি। পোস্টার, ফেস্টুন কিংবা বিলবোর্ডও তেমন চোখে পড়েনি। এর বিপরীতে বিএনপির প্রচারণা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে আরটিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি প্রার্থী ড. এম. এ. কাইয়ুম বলেন, ‘নাহিদ ইসলাম একটি দলের প্রধান এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ছিল। আমি তাকে খাটো করে দেখছি না। তবে আমি দীর্ঘদিন এই এলাকায় কাজ করেছি, মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রয়েছে। সেই জায়গা থেকেই আমি নির্বাচনে সিরিয়াসলি এগোচ্ছি। ইনশাআল্লাহ সবকিছু অনুকূলে থাকবে।’
এ ছাড়াও তিনি চাঁদাবাজি, মাদক, সন্ত্রাস ও বেকারত্ব দূরীকরণে নাহিদ ইসলামসহ সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা কামনা করেন।
নির্বাচনী প্রচারণা কম কেনো; এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আরটিএনএনকে বলেন, বিগত সময়ে দলীয় কাজের ব্যস্ততা ও জাতীয় স্বার্থে দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ করার কারণে নির্দিষ্ট করে ঢাকা-১১ আসনে খুব একটা সময় দেয়া হয় নাই, তবে আল্লাহ ভরসা। এখন থেকে শাপলা কলিতে ও গণভোটে ‘হ্যা’ ভোটের পক্ষে নিয়মিত গণসংযোগে ভোটারদের কাছে যাবো।
এনসিপির প্রধান ইদানীং ইসলামী জোটের শরীক দলের প্রধানদের সাথে একান্ত বৈঠক করছেন, যার ধারাবাহিকতায় ১১ তারিখে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও ১২ তারিখ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হকের সাথে বৈঠক করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামীক দল গুলোর সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করেই এগোতে চায় এনসিপি, বর্তমান সময়ের বৈঠক তারই ইঙ্গিত বহন করে।
এ বিষয়ে জামায়াত সমর্থক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা ঘরে-ঘরে কাজ করেছি।আধিপত্যবাদবিরোধী শক্তিগুলো এক হয়েছে। আতিকুর রহমান ভাইয়ের নেতৃত্বে আবার ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামলে ইনশাআল্লাহ নাহিদ ইসলাম জিতবে।
প্রচারণায় তুলনামূলক অনুপস্থিত থেকেও কি নাহিদ ইসলাম কোনো ‘চমক’ দেখাতে পারবেন? নাকি বিএনপির শক্ত অবস্থানই শেষ পর্যন্ত এম.এ. কাইয়ুমের জয় নিশ্চিত করবে?
ভোটের এখনো প্রায় এক মাস বাকি। কৌশলে আসতে পারে পরিবর্তন। তবে ঢাকা-১১ আসনের ফলাফলের দিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোটারসহ সবারই। কারণ এই আসনে জয় বা পরাজয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে সদ্য গঠিত তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপির ভবিষ্যৎ।
এফবি/আরটিএনএন
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!