খিলগাঁও চৌরাস্তা এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির নির্বাচনী অফিস থেকে ছুটে এলেন এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি। উদ্দেশ্য—তাসনিম জারার সঙ্গে একটু কথা বলবেন ও ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখবেন।
তাসনিম জারা আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বললেন এবং ছবির আবদারও পূরণ করলেন। লোকটি খুশি হয়ে আবার বিএনপির স্থানীয় কার্যালয়ে গিয়ে সবাইকে ছবি বের করে দেখাচ্ছিলেন। যেন আজকের দিনটায় তিনি সফল।
বলছি, ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার সঙ্গে কাটানো একটি দিনের কথা।
আরটিএনএন থেকে যোগাযোগ করা হয় তাসনিম জারার টিমের সঙ্গে। তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইন কেমন চলছে, ঢাকার জনগণ কতটা গ্রহণ করছে সদ্য এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা এই ডাক্তারকে। সেটা কাছ থেকে দেখাই ছিল আমাদের পরিকল্পনা।
ডাক্তার জারার টিমের সদস্য তন্বী, বাপ্পি ও আরও নাম না জানা অনেকে খুব সাবলীলভাবেই আরটিএনএনকে গ্রহণ করে নিলেন।
আজকের গন্তব্য খিলগাঁও চৌরাস্তা। বাংলা মোটরের সিগন্যাল ও রাস্তায় যানজট ঠেলে চৌরাস্তা এলাকায় পৌঁছে দেখি সাংবাদিকদের ভিড় জমেছে। তাসনিম জারা এক মিনিটও সময় এদিক-ওদিক না করে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।

কিন্তু সাংবাদিকরাই যেন হয়ে উঠলেন বিড়ম্বনার উৎস। তাসনিম জারা ঠিকমতো এগোতে পারছিলেন না।
জারার টিমের নারী সদস্যরা এত ফ্ল্যাশ লাইট ও ক্যামেরার ঝলকানিতে বিব্রতবোধ করছিলেন। জারা সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে একদম হাওয়া হয়ে গেলেন!
আমি তখন হন্যে হয়ে খুঁজছি—কোথায় গেলেন বিলেতফেরত এই ডাক্তার মশাই?
আসলে তিনি ক্যামেরা ও টিমের বাকিদের আলাদা রেখে স্বল্প কয়েকজনকে নিয়ে নিজের মতো করে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গেছেন। যে ক্যামেরা ও জনপ্রিয়তার জন্য অন্য নেতারা যখন বেফাঁস বক্তব্য থেকে শুরু করে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন, সেই ক্যামেরা ও জনপ্রিয়তাই যেন জারার জন্য নির্বাচনী প্রচারণায় বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যে পথে গণসংযোগ সেরে ডা. জারা এগোচ্ছিলেন, আমি ঠিক তার আশপাশেই সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে করতে এগোচ্ছিলাম। পথে কথা হলো খিলগাঁও থানারই ভোটার আবদুল মান্নানের সঙ্গে, যিনি ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক আগে থেকেই তাসনিম জারাকে চেনেন। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় জারার লোকবল কিংবা মিছিল তার চোখে পড়েনি। কিন্তু বিএনপির মিছিল প্রায়ই দেখেন।
অপরদিকে জামায়াত–এনসিপি জোটের প্রার্থী জাবেদ রাসিনকে চেনেন কি না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন—তিনি চেনেনও না, দেখেনওনি কখনো।

মূলত রাজনীতি জমে চায়ের দোকানে। তাই আমিও চায়ের দোকানে বসলাম এবং সবার আলাপ শুনতে শুরু করলাম। আশরাফ ও রশিদ নামে দুজন তাসনিম জারাকে নিয়েই আলোচনা করছিলেন। আমি সাংবাদিক পরিচয় দিতেই তারা খুবই আন্তরিকতা দেখালেন।
তারা জানালেন, জারাকে তারা আগে থেকেই চেনেন—টিভি ও মোবাইলে দেখেছেন। আজ সামনাসামনি দেখলেন। এবার এই আসনে বিএনপিকে তাসনিম জারার সঙ্গেই লড়াই করতে হবে বলে তাদের ধারণা।
কাঠের ব্যবসা করেন আবু সাঈদ—মধ্যবয়সী, কিছু চুল সাদা। নির্বাচনী হালচাল জানতে চাইলে প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও পরে নিজেই বললেন, “নির্বাচন নিয়ে এখনো চিন্তা করিনি। এখনও কে যোগ্য, কে অযোগ্য—তা ভাবার সময় পাইনি। তবে নির্বাচন আসলে, যদি সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে, ভোটকেন্দ্রে যাব। সেখানেই সিদ্ধান্ত নেব কাকে ভোট দেব।”
তবে নারীদের মাঝে চিত্রটা ভিন্ন। প্রায় প্রতিটি নারীই তাসনিম জারাকে চেনেন। নারীদের স্বাস্থ্য ও যৌন সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে আসছেন এই প্রার্থী। সে ক্ষেত্রে নারীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে—তবে এতটা জনপ্রিয়তা আছে, তা আমি জানতাম না।

দূর-দূরান্ত থেকে খবর পেয়ে ছুটে আসছিলেন নারী শিক্ষার্থী ও মধ্যবয়সী নারীরা। স্নিগ্ধা কামাল নামে এক নারী শিক্ষার্থী একটি বেসরকারি মেডিকেল ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করছেন। তিনি তাসনিম জারার ভক্ত। প্রথমে তিনি তার মায়ের সঙ্গে আসেন। তাসনিম জারাকে বলেন—জারাকে ভোট দিতে পারবেন, এটা ভেবেই তিনি আপ্লুত। এমনকি নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে তাসনিম জারার পক্ষে প্রচারণাও চালাচ্ছেন।
একটু পরেই ওই শিক্ষার্থী তার পরিবারের আরও প্রায় ৫–৬ জন সদস্যকে নিয়েও হাজির হন জারার ক্যাম্পেইনে।
প্রতিটি বাসার ব্যালকনি কিংবা জানালা খুলে মানুষ হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছিল তাসনিম জারাকে—যেন কোনো চলচ্চিত্রের চরিত্র সাধারণ মানুষের মাঝে এসে পড়েছে।
তাসনিম জারা সেদিন খুবই সাধারণ পোশাক পরেছিলেন। মুখে হাসি নিয়ে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি কেবল তার নির্বাচনী প্রতীক “ফুটবল”-এর প্রচারণাই করছিলেন না, গণভোটে “হ্যাঁ”-এর পক্ষেও লিফলেট বিতরণ করছিলেন।
এরই মাঝে এক ভদ্রলোক এসে অনুরোধ করলেন পুরান ঈদগাঁ মাঠের দিকে এগোতে। তার মেয়ে সারাদিন তাসনিম জারার নাম বলে—তাই মেয়েকে নিয়ে তিনি জারার সঙ্গে দেখা করাতে চান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি তার মেয়েকে নিয়ে হাজির হলেন জারার ক্যাম্পেইনে।
তবে কিছু ব্যক্তি আমাকে বলছিলেন, “কোনো বেডি মানুষরে আর ভোট দিমু না। এক ডাইনি ১৬ বছর জ্বালাইছে। এইবার বেডা মানুষরে ভোট দিমু। হেই বেডি মানুষ, ডাক্তারি করবো—হেই এমপি হইয়া কী করবো?”
তার পাশেই আরেক ব্যক্তি বলছিলেন, “লাভ নাই, লাভ নাই। এই আসনের প্রতিটা বেডি মানুষ এইবার এই ডাক্তারনিকেই ভোট দিবো। মাইয়া মানুষগো হাত কইরা লইছে।”
দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা, ঢাকা-৯ আসনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার মো. রফিকুল বাসারের বক্তব্য ছিল একেবারেই ভিন্ন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ নারীকে নবুয়ত দেন নাই কেন জানেন? এই কম বুদ্ধির কারণে। এই আসনে জামায়াতের বড় ভোটব্যাংক আছে। জারা ডাক্তার হিসেবে জনপ্রিয়। তার জনপ্রিয়তা আর জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি এক হলে সে নিশ্চিত এমপি হতো। কিন্তু সে বোকামি করে কয়েকজন মেয়েকে নিয়ে এনসিপি থেকে বের হয়ে গেল। এতে এনসিপিরও ক্ষতি হলো, তাসনিম জারারও ক্ষতি হলো।’

তিনি আরও বলেন, “জামায়াত জোটের জাবেদ রাসিনকে জামায়াতের সবাই ভোট দেবে। তাসনিম জারাকে হয়তো মহিলারা কিছু ভোট দেবে। কিন্তু এই অন্তর্কন্দলের লাভটা হলো বিএনপির হাবিবের।”
ভোটের মাঠে ‘হাদি ইফেক্ট’ যে বেশ জায়গা করে নিয়েছে, তা সেদিন টের পাই। এক ভদ্রমহিলা ঢাকা-৮-এর ভোটার। তিনি ওসমান হাদিকে ভোট দিতে পারবেন না ভেবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তাসনিম জারাকে দেখে। তাসনিম জারাও আশ্বস্ত করেন—তিনি হাদি হত্যার বিচারের জন্য কাজ করবেন।
কয়েকজন মুরুব্বি দূর থেকে এসব পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আমি কাছে গেলে তারা বললেন, এরকম মেধাবীরাই দেশের হাল ধরবে, এটাই তো আমরা চাই। তবে এলাকায় যে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি—তাসনিম জারা তো মহিলা মানুষ, তিনি কি এসব সামাল দিতে পারবেন?
তাসনিম জারার গণসংযোগের পথের উল্টো দিকে ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়। রাস্তার ওপাশ থেকে তাসনিম জারাকে দেখে বিএনপির কর্মী-সমর্থকেরা উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। আমি এগিয়ে যাই কার্যালয়ের দিকে। ওয়ার্ড সভাপতি এম. জামানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘জামায়াত একটি দেশবিরোধী শক্তি। এনসিপি তাদের সঙ্গে গিয়ে ভুল করেছে। কিন্তু তাসনিম জারা দেশপ্রেমিক, আমরাও (বিএনপি) দেশপ্রেমিক। রাজাকারদের সঙ্গ ছেড়ে আসায় তাসনিম জারাকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা।’
আমি প্রশ্ন করি, ‘তাহলে বিএনপি কেন জামায়াতের মতো এই দেশবিরোধী শক্তির সঙ্গে এত দীর্ঘ সময় জোটে ছিল?’
উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ভুল বুঝে আলাদা হয়েছি। জারাও আলাদা হয়েছে। আমরা এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জারার মতো নেতৃত্ব চাই। আমরা তার বিপরীতে লড়ার জন্য সব প্রস্তুতি নিয়েছি।’

তবে পার্টি অফিসে অবস্থানরত অনেকেই তখনও তাসনিম জারার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অনেকে তাকে একনজর কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বিএনপি নেতারা তাদের সেদিকে যেতে নিষেধ করেন। কয়েকজন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জারার সঙ্গে ছবি তুলে এসে সবাইকে দেখিয়ে সফলতার হাসিও হাসছিলেন।
কিন্তু এতো জনপ্রিয়তা কি ভোটে রূপ নেবে?
অনলাইন জনপ্রিয়তাই কি ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভিত্তি?
নাকি সাংগঠনিক শক্তির কাছে হার মানবে তাসনিম জারার জনপ্রিয়তা?
লিঙ্গ ফ্যাক্টরে নারীদের ভোট টানবেন ডা. জারা। অপরদিকে পুরুষ ভোটাররা এগোচ্ছেন বিএনপির হাবিব, জামায়াত–এনসিপির জাবেদ রাসিন ও চরমোনাইয়ের প্রার্থীর দিকে। কোন দিকে মোড় নেবে ঢাকা-৯-এর ভোটাররা?
সন্ধ্যার দিকে শুরু হওয়া গণসংযোগ শেষ হওয়ার কোনো নাম নেই। আমারও মাঠের অবস্থা অনেকটা আঁচ করা হয়ে গেছে।
রাত দশটার দিকে আমি খিলগাঁও থেকে চলে আসি, কিন্তু মাথায় রয়ে যায় অনেক প্রশ্ন।
১২ তারিখ আর বেশি দূরে নয়। দীর্ঘদিন পর ভোটাররা বৈধ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। ঢাকা-৯ আসনে জনপ্রিয়তা বনাম সাংগঠনিক শক্তির লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে—তা সেদিনই জানা যাবে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!