বিশ্বকাপ
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ভ্রমণ একনজরে   ফাইল ছবি

খেলা ডেস্ক | RTNN

আর মাত্র ছয় মাস পরই শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর—ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। আগামী বছরের ১১ জুন শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টের ড্র ও সূচি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী দলগুলো এখন ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। তবে মাঠের কৌশল আর টেকনিকের পাশাপাশি এবার দলগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে দীর্ঘ ভ্রমণ।

কারণ, এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন করা হচ্ছে তিনটি দেশে—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে। ফলে গ্রুপ পর্বেই অনেক দলকে শত শত, এমনকি হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যেখানে ভেন্যুগুলো ছিল কাছাকাছি, সেখানে ভ্রমণ নিয়ে দলগুলোর কোনো বড় চিন্তা ছিল না। কিন্তু উত্তর আমেরিকায় সেই বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন।

তিন আয়োজক দেশই গ্রুপ পর্বের ম্যাচ নিজেদের দেশেই খেলবে। তবে এক দেশ থেকে আরেক ভেন্যুর দূরত্বের পার্থক্য বড় হওয়ায় ভ্রমণের চাপেও তারতম্য থাকবে। তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে স্বস্তিকর অবস্থানে আছে মেক্সিকো। তারা গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও উয়েফার প্লে-অফ জয়ী দলের বিপক্ষে খেলবে। তিনটি ম্যাচই হবে মেক্সিকোতে—দুটি মেক্সিকো সিটিতে, একটি গুয়াদালহারায়।

কানাডা গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ খেলবে ভ্যাঙ্কুভারে—কাতার ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। আর উয়েফা প্লে-অফ জয়ী দলের বিপক্ষে তাদের ম্যাচ হবে টরন্টোতে। যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রুপ পর্বে খেলতে হবে সিয়াটল ও লস অ্যাঞ্জেলেসে। তাদের প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে, অস্ট্রেলিয়া এবং উয়েফার প্লে-অফ জয়ী দল। তিন আয়োজকের মধ্যে ভেন্যুর দূরত্ব বিবেচনায় কানাডাকেই সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করতে হবে।

শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর ভ্রমণ অভিজ্ঞতাও একেক রকম। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জন্য গ্রুপ পর্ব তুলনামূলক আরামদায়ক। তাদের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস ও কানসাস সিটিতে—মোট ভ্রমণ ৪৬১ মাইল। অন্যদিকে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে গ্রুপ পর্বে পাড়ি দিতে হবে ১,০৯৪ মাইল।

২০২২ বিশ্বকাপের রানার্সআপ ফ্রান্স গ্রুপ পর্বে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। তবে ফেবারিটদের মধ্যে ইংল্যান্ডকে বেশ ভ্রমণ করতে হবে। ক্রোয়েশিয়া, ঘানা ও পানামার বিপক্ষে তাদের ম্যাচ হবে ম্যাসাচুসেটস ও টেক্সাসে।

পরিসংখ্যান বলছে, কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে সব দল মিলিয়ে গড়ে ভ্রমণ ছিল মাত্র ৮৬ মাইল। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৫,১৬৭ মাইল। যদিও ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে গড়ে ৭,০৫৪ মাইল ভ্রমণের তুলনায় এবারের চাপ কিছুটা কম।

এবার সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করতে হবে উয়েফা উইনার প্লে-অফের ইতালি, ওয়েলস, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও নর্দান আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার লড়াইয়ে জয়ী দলকে—মোট ৩,১৪৪ মাইল। প্লে-অফ ডি জয়ী দলকে পাড়ি দিতে হবে ২,৮১১ মাইল, আর আলজেরিয়ার ভ্রমণ হবে ২,৯৭২ মাইল। কানাডা, বেলজিয়াম, কেপ ভার্দে, ইকুয়েডরসহ আরও কয়েকটি দলকে ভ্রমণ করতে হবে দেড় থেকে দুই হাজার মাইলের বেশি।

দীর্ঘ ভ্রমণের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে স্পোর্টস সায়েন্সেও। সান ডিয়েগো এফসির হেড অব হিউম্যান পারফরম্যান্স লুক জেনকিনসন জানান, তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয়ই উত্তর আমেরিকার ফুটবলে ভ্রমণের প্রভাব। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘ ভ্রমণে খেলোয়াড়দের ঘুমের ছন্দ নষ্ট হয়, হজমে সমস্যা দেখা দেয় এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে—যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পারফরম্যান্সে।

ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসের ফিজিক্যাল প্রস্তুতি বিভাগের প্রধান জন পোলির মতে, পর্যাপ্ত রিকভারি না পেলে লম্বা সফরে মাংসপেশির চোটের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

সবশেষে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বড় অস্ত্র হলো মানসিক দৃঢ়তা। প্যাসিফিক এফসির মেরিমান বলেন, ক্লান্তিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে সেটাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আর ইয়র্গেনসনের বার্তা স্পষ্ট—ভ্রমণকে বোঝা নয়, সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। ইতিবাচক মানসিকতা, সঠিক রিকভারি আর প্রস্তুতিই পারে দীর্ঘ সফরের ধকল সামলে বিশ্বকাপের মঞ্চে সেরা পারফরম্যান্স এনে দিতে।