এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বল এতটা টার্ন এর আগে করেনি। সুইংয়ের দিক থেকেও এটি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কন্ডিশন ছিল বেশ কঠিন। বাউন্ডারি ছিল বিশাল। বল ব্যাটে লাগিয়ে বাউন্ডারি পার করা তো দূরের কথা, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাই ছিল কঠিন। বিশেষ করে একদিকে বাউন্ডারি ছিল ৭৫ মিটারেরও বেশি। টস হেরে ব্যাট করতে নামা নিউজিল্যান্ডের লক্ষ্য খুব বড় ছিল না। ম্যাচ শেষে রাচিন রবীন্দ্র বলেছিলেন, "আমরা সম্ভবত ১৫০ রানের কথা ভাবছিলাম।" শেষ পর্যন্ত তারা ৭ উইকেটে ১৬৮ রান তোলে।
তবে আসল নাটকটা জমে ওঠে ৮৪ রানে ৬ উইকেট পড়ার পর। মিচেল স্যান্টনার এবং কোল ম্যাককঞ্চি জুটি বেঁধে নিউজিল্যান্ডকে খাদের কিনারা থেকে তুলে আনেন এবং এমন এক স্কোরে পৌঁছে দেন, যা রান তাড়ায় নামার আগেই শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ স্বপ্ন কার্যত শেষ করে দেয়।
দুজনেই পরে স্বীকার করেছেন যে শুরুতে তারা কিছুটা স্নায়ুচাপে ছিলেন। স্যান্টনার ৮ বলে ৩ এবং ম্যাককঞ্চি ১১ বলে ৩ রানে ছিলেন। তাদের দোষ দেওয়া যায় না। কারণ এর আগে অভিজ্ঞ ব্যাটাররাও ধুঁকেছেন। ফিন অ্যালেন ক্যারম বলে পরাস্ত হন। মার্ক চ্যাপম্যান অফব্রেকের ফাঁদে পড়েন। ড্যারিল মিচেল এমন এক বাঁহাতি অর্থোডক্স ডেলিভারিতে বোল্ড হন, যা একদমই ঘোরেনি। যারা স্পিন সামলেছেন, তারাও দুশমন্ত চামিরার গতির কাছে হার মেনেছেন।
তবে পানি পানের বিরতি তাদের নতুন করে পরিকল্পনা সাজানোর সুযোগ করে দেয়। স্যান্টনার এর আগেও এমন কন্ডিশনে ব্যাট করেছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, এখানে শুরু করাটা সহজ ছিল না। কঠিন সময়টা হয়তো পার হয়ে গেছে। শেষ পাঁচ ওভারে তাদের লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার—একটু চড়াও হওয়া। ম্যাককঞ্চির ভাষায়, "স্পিনের বিরুদ্ধে একটু বেশি সচল হওয়া।"
বিরতির পর প্রথম দশ বলে কোনো বাউন্ডারি আসেনি। এগারোতম বলে ম্যাককঞ্চি ক্রিজের আড়াআড়ি গিয়ে শর্ট ফাইন লেগ দিয়ে সুইপ করে বাউন্ডারি মারেন, যা ৩৩ বল পর নিউজিল্যান্ডের প্রথম বাউন্ডারি ছিল। ম্যাককঞ্চি ব্যাখ্যা করেন, "ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকলে এই উইকেটে খেলা কঠিন হতো। ফিল্ডাররা আমাদের চেপে ধরেছিল, বোলাররাও ভালো বল করছিল। তাই আমরা সুইপ করা, পায়ের ব্যবহার বা ক্রিজের গভীরতা ব্যবহারের পরিকল্পনা করি। একটু বেশি সচল হওয়ার চেষ্টা থেকেই আমাদের জুটির মোমেন্টাম তৈরি হয়।"
শ্রীলঙ্কার ফিল্ডিং সাজানো ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। দিলশান মাদুশঙ্কা শুরু করেছিলেন শর্ট মিড-অফ দিয়ে। দুনিথ ভেল্লালাগের বোলিংয়ের সময় ৭৫ মিটার বাউন্ডারির বেশ ভেতরে ডিপ মিড-উইকেট ফিল্ডার রাখা হয়েছিল। ছোট ৬২ মিটার বাউন্ডারির দিকে সবসময় বাড়তি সুরক্ষা ছিল।
রবীন্দ্র বলেন, "মাঝের ওভারে শ্রীলঙ্কার ফিল্ডিং ছিল চমৎকার এবং তারা আমাদের ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করেছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিল ডট বল কমিয়ে সিঙ্গেলস নেওয়া এবং পার্টনারশিপ গড়া।" নিউজিল্যান্ড অপেক্ষা করছিল পেসারদের জন্য। অবশেষে শ্রীলঙ্কা সেই সুযোগ দেয়। শেষ চার ওভারের তিনটিই করা হয় পেসারদের দিয়ে।
ম্যাককঞ্চির জন্য অফ সাইডের বাউন্ডারি ছিল বড়। এর মানে তিনি লেগ সাইডে হাত খুলে খেলার ঝুঁকি নিতে পারতেন। চামিরা যখন ফুল লেংথে জোরে বল করেন, ম্যাককঞ্চি তা মিড-উইকেটের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন। স্লোয়ার বলের জন্যও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তার ইনটেন্ট বা উদ্দেশ্য একই ছিল, শুধু টাইমিংয়ে পরিবর্তন এনেছিলেন।
চামিরা যখন রাউন্ড দ্য উইকেট বল করতে আসেন, ম্যাককঞ্চি তখন বড় বাউন্ডারির দিকে মাটিতে গড়িয়ে খেলার নিরাপদ পথ বেছে নেন এবং পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি আদায় করেন। স্যান্টনারও পরিস্থিতি দ্রুত বুঝে ফেলেন। মাহিশ থিকশানা বল বাইরে ঘোরাচ্ছিলেন। স্যান্টনার খাটো লেংথের বল কাট করেন, আর ফুল লেংথের বল স্লগ সুইপ করে ছোট বাউন্ডারির দিকে পাঠান। চাপে পড়ে ফুল টস দিলে সেটাও সীমানা ছাড়া হয়। দুই ওভারে আসে ৩৯ রান। নিউজিল্যান্ডের স্কোর হঠাৎ করেই ৬ উইকেটে ১৩৭-এ পৌঁছে যায়।
ডেথ ওভারে শ্রীলঙ্কা পেসারদের ওপরই ভরসা রাখে। কিন্তু মাদুশঙ্কা ওয়াইড ইয়র্কার মিস করে স্যান্টনারের জোনে বল দেন। চামিরাও সঠিক জায়গায় বল ফেলতে ব্যর্থ হন। স্লো ওভার রেটের কারণে বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডার সংখ্যা চারে নামিয়ে আনা হয়, যা নিউজিল্যান্ডের জন্য বড় সুবিধা হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাককঞ্চি বলেন, "এটা ছিল পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ এবং নিজের সুইংয়ের ওপর বিশ্বাস রাখা। ছোট বাউন্ডারিতে খুব জোরে মারার দরকার নেই, শুধু সঠিক পজিশনে থেকে বলের লাইনে যাওয়াটাই জরুরি।"
১৬টি সিঙ্গেল এবং চারটি ডাবলস নিয়ে গড়া ৪৭ বলের এই জুটিতে টিকে থাকা এবং পরে আক্রমণের কৌশল ছিল স্পষ্ট। রবীন্দ্র বলেন, "ডাগআউটে আমরা কিছুটা চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু তারা যেভাবে চাপ সামলে সঠিক সময়ে পাল্টা আক্রমণ করেছে, তা ছিল অসাধারণ। বাঁহাতি-ডানহাতি জুটি এবং ছোট বাউন্ডারিকে টার্গেট করা—সবই ছিল আমাদের পরিকল্পনার অংশ।"
দাসুন শানাকা পেসারদের ওপর ভরসা রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, "চামিরা ও মাদুশঙ্কা গত দুই ম্যাচে ডেথ ওভারে ভালো করেছিল। কিন্তু দিনটা তাদের ছিল না। মাহিষও চাপে পড়ে প্যানিক করেছিল। এটা মানসিক ব্যাপার। খেলোয়াড় হিসেবে তাদেরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।"
নিউজিল্যান্ড উপায় খুঁজে বের করেছে। ভারত থেকে এসে এক সপ্তাহ অপেক্ষার পর মাঠে নামা সহজ ছিল না। কিছুটা মরচে ধরা বা ধীরগতিতে শুরু হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তারা চাপ সামলে, নতুন করে পরিকল্পনা সাজিয়ে সঠিক সময়ে আঘাত হেনেছে।আর এভাবেই তারা শুধু ১৬৮ রানই তোলেনি, বরং পুরো রাতের চিত্রটাই বদলে দিয়েছে।
সূত্র : ক্রিকবাজ
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!