বাংলাদেশ ক্রিকেট, পাকিস্তান, ওয়ানডে সিরিজ
মাজ সাদাকাতের অনবদ্য ব্যাটিং প্রদর্শণী দেখা যায় দ্বিতীয় ওয়ানডেতে   ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার ম্যাচ মানেই নাটকীয়তা আর ভূতুড়ে ব্যাটিং ধস। মিরপুরের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও এর ব্যতিক্রম হলো না। তবে ম্যাচের সব আলোচনা ছাপিয়ে কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সালমান আঘার অদ্ভুত রান আউট, যার পরপরই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে পাকিস্তানের ইনিংস।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য এসব নাটকের প্রভাব ফলাফলের ওপর পড়েনি। শুক্রবার (১৩ মার্চ) বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে ডিএলএস (DLS) মেথডে বাংলাদেশকে ১২৮ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে পাকিস্তান। মাঠের উত্তেজনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আবহাওয়াও এদিন রূপ বদলেছে; বজ্রপাত আর শিলাবৃষ্টি ম্যাচের নাটকীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। সিরিজে এখন ১-১ সমতা, ফলে রবিবার শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে হতে যাওয়া শেষ ম্যাচটি কার্যত অলিখিত ফাইনালে রূপ নিয়েছে।

এদিনও পাকিস্তানকে ঘাসের উইকেটে আগে ব্যাট করতে পাঠানো হয়। তবে এবার মাজ সাদাকাত কোনো ছাড় দেননি। ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলতে নেমে এই বাঁহাতি ওপেনার শুরুতেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। মুস্তাফিজুর রহমানের করা দ্বিতীয় ওভারে দুটি বাউন্ডারি এবং তাসকিন আহমেদকে স্কয়ারের সামনে-পেছনে দুটি ছক্কা হাঁকান। অন্য প্রান্তে সাহেবজাদা ফারহান দর্শকের ভূমিকায় থাকলেও পাকিস্তান দ্রুত রান তুলতে থাকে। পঞ্চম ওভারে নাহিদ রানাকে আনা হলেও তিনিও সাদাকাতের তোপ থেকে রেহাই পাননি।

সপ্তম ওভারেই দলীয় ৫০ পার করে পাকিস্তান, আর নবম ওভারে রানার ওপর চড়াও হয়ে ৩১ বলেই ফিফটি তুলে নেন সাদাকাত। পাওয়ার প্লেতে ৮৫/০ তুলে পাকিস্তান তখন ধ্বংসাত্মক মেজাজে। তবে ১৩তম ওভারের শেষ বলে ১০৩ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। স্কুপ করতে গিয়ে উইকেটকিপারের হাতে ধরা পড়েন সাদাকাত। তাঁর ৪৬ বলে ৭৫ রানের ইনিংসে ছিল ছয়টি চার ও পাঁচটি ছক্কা।

তাঁর বিদায়ের পর রানের গতি কিছুটা কমে যায়; পরের ১৩ ওভারে আসে মাত্র ৪৬ রান। ফারহান ডিপ থার্ড ম্যানে ক্যাচ দেন এবং শামাইল হুসাইন রানার বলে পুল করতে গিয়ে আউট হন। মোহাম্মদ রিজওয়ানের শুরুটা ধীরগতির হলেও সালমান আঘা পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। তিনি দ্রুত ফিফটি তুলে নেন এবং রিজওয়ানের সঙ্গে চতুর্থ উইকেটে ১০৯ রানের দারুণ জুটি গড়েন।

বড় স্কোরের দিকে এগোচ্ছিল পাকিস্তান, তখনই ঘটে বিপত্তি। নিজের বোলিংয়ে বল থামাতে গিয়ে নন-স্ট্রাইক প্রান্তে আঘার সঙ্গে ধাক্কা লাগে মিরাজের। ক্রিজের বাইরে থাকা আঘা অদ্ভুতভাবে বলটি বোলারকে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু মিরাজ তার আগেই আন্ডারআর্ম থ্রোতে স্টাম্প ভেঙে দেন। ক্ষুব্ধ আঘা গ্লাভস ও হেলমেট ছুঁড়ে মারতে মারতে মাঠ ছাড়েন। একই ওভারে রিজওয়ানও স্লগ-সুইপ করতে গিয়ে আউট হন। এরপরই ধস নামে। ফাহিম আশরাফের ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট হন আব্দুল সামাদ। লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন শেষের দিকে দ্রুত উইকেট তুলে নিলে ২৭৪ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। শেষ ৭ উইকেট তারা হারায় মাত্র ৪৩ রানে।

জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল ভয়াবহ। মাত্র ১৫ রানেই প্রথম তিন উইকেট হারায় তারা। দুই ওপেনার তানজিদ হাসান ও সাইফ হাসান সহজেই বিদায় নেন এবং নাজমুল হোসেন শান্ত শূন্য রানে বোল্ড হন। ফিল্ডিংয়ের সময় হুসাইন তালাত কাঁধে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন, যা ছিল পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগের। এর কিছুক্ষণ পরেই বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। আবহাওয়া ঠিক হলে বাংলাদেশের সামনে নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩২ ওভারে ২৪৩ রান।

খেলা পুনরায় শুরু হলে আস্কিং রেট সাড়ে আটের কাছাকাছি ছিল। লিটন দাস ও তৌহিদ হৃদয় পাল্টা লড়াইয়ের চেষ্টা করেন। লিটন দুটি ছক্কাও হাঁকান, এমনকি সাদাকাতের বলে জীবনও পান। তবে বল হাতে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেন সাদাকাতই; বাঁহাতি স্পিনে লিটনকে এলবিডব্লিউ করেন তিনি। এরপর দ্রুত আরও তিনটি উইকেট পড়ে। ব্যাট হাতে ঝড় তোলার পর বল হাতেও ৩ উইকেট নিয়ে দিনটি নিজের করে নেন সাদাকাত। হারিস রউফ হৃদয়কে (২৮) এলবিডব্লিউ করলে বাংলাদেশের আশা শেষ হয়ে যায়। ২৪তম ওভারের মাঝপথে ১১৪ রানেই অলআউট হয় স্বাগতিকরা। বল হাতে সাদাকাত ও রউফ ৩টি করে উইকেট নেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
পাকিস্তান: ২৭৪ অলআউট, ৪৭.৩ ওভার (মাজ সাদাকাত ৭৫, সালমান আঘা ৬৪; রিশাদ হোসেন ৩-৫৬, মেহেদী হাসান মিরাজ ২-৩৪)।
বাংলাদেশ: ১১৪ অলআউট, ২৩.৩ ওভার (লিটন দাস ৪১; মাজ সাদাকাত ৩-২৩, হারিস রউফ ৩-২৪)।
ফলাফল: পাকিস্তান ১২৮ রানে জয়ী (ডিএলএস মেথড)।