একটা সময় ছিল যখন তিন হাতলওয়ালা এই লিগ কাপের ট্রফিটাকে পেপ গার্দিওলার ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে হতো। ২০১৮ সালে আর্সেনালকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এই ট্রফি জিতেছিলেন ম্যানচেস্টার সিটি বস, এরপর টানা তিন মৌসুম সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করেছিলেন।
মাঝের কয়েক বছর এই টুর্নামেন্টে গার্দিওলা ও তাঁর দলের ভাগ্য খুব একটা সুপ্রসন্ন ছিল না। কিন্তু এবারের ফাইনালে তারা ফিরল রাজকীয়ভাবে। তবে প্রেক্ষাপটটা ছিল ভিন্ন। সাম্প্রতিক ফর্মহীনতা এবং চলতি মৌসুমে ইংল্যান্ড ও ইউরোপজুড়ে আর্সেনালের আধিপত্যের কারণে ফাইনালে সিটিকে ‘আন্ডারডগ’ হিসেবেই ভাবা হচ্ছিল।
কিন্তু ওয়েম্বলিতে সিটি আবারও নিজেদের পুরোনো রূপ দেখাল—সেই চিরাচরিত শান্ত মেজাজ আর দলের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া। অন্যদিকে আর্সেনাল যেন চাপ সামলাতে না পেরে খেই হারিয়ে ফেলল। গার্দিওলার কৌশল ছিল নিখুঁত। প্রথমার্ধটা কিছুটা সতর্কভাবে কাটানোর পর, দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে সিটি।
সব মৌসুমে একজন লেফট-ব্যাক কাপ ফাইনালের নায়ক হন না, কিন্তু নিকো ও’রাইলির জন্য দিনটা ছিল এমনই। নিজের তরুণ ক্যারিয়ারের সেরা দিনটি কাটালেন ২১ বছর বয়সী এই তারকা। দুটি গোলই তিনি করেছেন হেডে। প্রথম গোলটি আসে আর্সেনালের রিজার্ভ গোলরক্ষক কেপা আরিজাবালাগার ভুলে। বল গ্রিপ করতে গিয়ে হাত ফসকে ফেলেন কেপা, আর সেই সুযোগ কাজে লাগান ও’রাইলি। ওয়েম্বলি ফাইনালে কেপার হতাশার গল্প যেন শেষই হচ্ছে না। এটি ছিল গার্দিওলার অধীনে সিটির ১৬তম মেজর ট্রফি (কমিউনিটি শিল্ড বাদে)।
২০২৩ সালের কমিউনিটি শিল্ড থেকে শুরু করে সিটির বিপক্ষে আগের ছয়টি দেখায় অপরাজিত ছিল আর্সেনাল। কমিউনিটি শিল্ড কি মিকেল আর্তেতার জন্য ট্রফি হিসেবে গণ্য হবে? উত্তরটা ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’—তবে পাল্লাটা ‘না’-এর দিকেই ভারী। ২০২০ সালে চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপ জয়ই এখন পর্যন্ত আর্তেতার একমাত্র বড় সাফল্য।
ম্যানেজার হিসেবে এটি ছিল আর্তেতার দ্বিতীয় কাপ ফাইনাল। কিন্তু দিনটি তাঁর পরিকল্পনামাফিক যায়নি। ইনজুরির কারণে দলের অন্যতম ভরসা ইবেরেচি ইজেকে পাননি তিনি। তাঁর সৃজনশীলতার অভাব বোধ করেছে দল, তবে আর্সেনালের এমন ছন্নছাড়া পারফরম্যান্সের ব্যাখ্যা শুধু এটি হতে পারে না।
আর্সেনালের এই হারের প্রভাব প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা দৌড়ে পড়ে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সিটি বর্তমানে ৯ পয়েন্ট পিছিয়ে থাকলেও তাদের হাতে একটি বাড়তি ম্যাচ রয়েছে এবং ১৯ এপ্রিল ঘরের মাঠে আর্সেনালের মুখোমুখি হবে তারা। আর্সেনালের চার শিরোপা বা ‘কোয়াড্রড্রপল’ জয়ের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে বড় মঞ্চে ট্রফি জয়ের সক্ষমতা নিয়ে।
ম্যাচের সপ্তম মিনিটে আর্সেনাল একটি বড় সুযোগ পেয়েছিল। মার্টিন জোবিমেন্ডির পাসে কাই হাভার্টজ গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ডের সঙ্গে ওয়ান-অন-ওয়ানে চলে যান। কিন্তু ট্রাফোর্ড সেই শট রুখে দেন। এরপর রিবাউন্ড থেকে বুকায়ো সাকা দুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ম্যাচে আর্সেনালের উল্লেখ করার মতো ঘটনা ছিল এটুকুই। ওপেন প্লে বা সেট পিস—কোথাও সুবিধা করতে পারেনি তারা। উল্টো সিটির সমর্থকরা ‘বোরিং, বোরিং আর্সেনাল’ বলে দুয়োধ্বনি দিচ্ছিল। পুরো ম্যাচজুড়েই বলের দখল ও নিয়ন্ত্রণ ছিল সিটির পায়ে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে একটি দৃশ্য আর্সেনালের অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তোলে। গোলরক্ষক কেপার পায়ে বল, কিন্তু সামনে সতীর্থরা কেউ মুভ করছেন না। বাধ্য হয়ে তিনি অন্য উপায় খুঁজলেন। আর্সেনাল তাদের ‘বিল্ড-আপ’ প্লে বা নিচ থেকে খেলা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
৫০তম মিনিটে ম্যাথুস নুনেসের একটি পাস থেকে জেরেমি ডোকু বেরিয়ে গেলে কেপা বক্সের বাইরে এসে তাঁকে ফাউল করেন। আর্সেনালের ডিফেন্ডাররা কাছাকাছি থাকায় লাল কার্ডের বদলে হলুদ কার্ড দেখেন তিনি। গার্দিওলার মাস্টারস্ট্রোক ছিল ডান উইংয়ে অ্যান্টোনি সেমেনিওকে নামানো এবং রায়ান চেরকিকে মাঝমাঠজুড়ে খেলার স্বাধীনতা দেওয়া। সেমেনিও আর্সেনাল লেফট-ব্যাক পিয়েরো হিলকাপিয়ের চেয়ে দ্রুতগতির ছিলেন এবং সেই সুযোগটাই নিয়েছে সিটি। চেরকির ক্রস থেকেই কেপা তালগোল পাকান এবং ও’রাইলি প্রথম গোলটি করেন।
কেপা আরিজাবালাগা এ নিয়ে তিনটি লিগ কাপ ফাইনাল খেলে তিনটিতেই হারলেন (প্রথম দুটি চেলসির হয়ে)। ২০১৯ সালে সিটির বিপক্ষেই টাইব্রেকারের আগে মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। সেবার একটি পেনাল্টি ঠেকালেও দলকে জেতাতে পারেননি। ২০২২ সালে লিভারপুলের বিপক্ষে টাইব্রেকারে তিনি নিজেই পেনাল্টি মিস করেন। ২০২১ এফএ কাপ ফাইনালেও হারের স্বাদ পেয়েছেন তিনি।
ও’রাইলির প্রথম গোলের পর আনন্দে বিজ্ঞাপনী বোর্ডে লাথি মারেন গার্দিওলা। আর দ্বিতীয় গোলের সময় টাচলাইন ধরে দৌড় শুরু করেন। নুনেসের ক্রস থেকে ও’রাইলি যখন দ্বিতীয় গোলটি করেন, তখন সিটির জয় নিশ্চিত হয়ে যায়। ম্যাচের শেষদিকে বদলি হিসেবে নামা রিকার্ডো ক্যালাফিয়োরি আর্সেনালের হয়ে একটি সুযোগ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু তাঁর হেড ট্রাফোর্ড ঠেকিয়ে দেন এবং আরেকটি শট পোস্টে লাগে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর্তেতা তাঁর খেলোয়াড়দের নিয়ে মাঠেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং সিটিকে ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে দেখলেন। এখন আর্সেনাল এই ধাক্কা সামলে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটাই দেখার বিষয়।
সূত্র : দা গার্ডিয়ান
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!