বিসিবি
বোর্ড সভায় একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।   ছবি: আরটিএনএন

দুপুরে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের দীর্ঘ ম্যারাথন সভা। বৈঠকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে, পাশাপাশি কিছু বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন এবং নতুন উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো সাদা বলের ক্রিকেটে দুই সংস্করণের দলের অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কদের মেয়াদ দীর্ঘমেয়াদে বাড়ানো। বোর্ড মনে করছে, নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা দলের পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রবিবার (৫ এপ্রিল) সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলেছেন বিসিবির পরিচালক মোখসেদুল কামাল। তিনি জানান, গতকালকের সভায় দেশের ক্রিকেটকে আরও সুসংগঠিত ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে বোর্ড একাধিক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে একগুচ্ছ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয় দলের নেতৃত্ব নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সংস্কার এবং খেলোয়াড়দের সামাজিক সুরক্ষা—সব মিলিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে বিসিবি।

২০২৮ পর্যন্ত নেতৃত্বে লিটন ও মিরাজ

আসন্ন দুটি বড় আইসিসি ইভেন্টকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্বের পরিকল্পনা সাজিয়েছে বিসিবি। গতকালের বোর্ড মিটিং এ নাজমুল আবেদীন ফাহিম এই কথা জানান যে, ২০২৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছোট ফরম্যাটের দলের অধিনায়ক থাকছেন লিটন কুমার দাস। তার ডেপুটি বা সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তরুণ সাইফ হাসান।

অন্যদিকে, ২০২৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মেহেদী হাসান মিরাজকে ওয়ানডে দলের অধিনায়ক হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে। তার সাথে সহ-অধিনায়ক হিসেবে থাকছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। নেতৃত্বের এই স্থিতিশীলতা দলের পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্বাস বিসিবির। 

বিসিবিতে অনুমোদিত হলো আধুনিক এইচআর পলিসি

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাদের দাপ্তরিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নতুন একটি হিউম্যান রিসোর্স পলিসি বা মানবসম্পদ নীতি অনুমোদন করেছে। বোর্ডের গতকাল অনুষ্ঠিত বৈঠকে নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই  বিসিবির প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও চেইন অব কমান্ড নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছিল। নতুন এই এইচআর পলিসির মূল লক্ষ্য হলো বোর্ডের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাজের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি পেশাদার কর্মপরিবেশ তৈরি করা।

অনেক সময় ফ্রানচাইজি প্লেয়ারদের পেমেন্ট ইস্যু নিয়ে নানান বিতর্ক দেখা দেয়। এগুলোসহ  নতুন নীতিমালায় বিসিবির প্রতিটি পদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও দায়িত্ব   নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পারফরম্যান্স মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।

বোর্ডের প্রতিটি বিভাগের কাজের পরিধি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, যাতে কাজের ওভারল্যাপিং না হয় এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজের জন্য দায়বদ্ধ থাকেন। 
বিশেষ করে আইসিসি বা অন্যান্য ক্রিকেট বোর্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতা অর্জনই এর উদ্দেশ্য। শুধু নিয়মকানুন নয়, স্টাফদের কল্যাণ ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধার দিকেও নজর দিয়েছে বোর্ড। স্বাস্থ্য বিমা, ইনসেন্টিভ এবং কর্মক্ষেত্রে উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও এই পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিসিবি মনে করছে, মাঠের ক্রিকেটে উন্নতির পাশাপাশি মাঠের বাইরের প্রশাসনকেও সমানভাবে দক্ষ হতে হবে। এই এইচআর পলিসি কার্যকর হলে বিসিবির দাপ্তরিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সকল সেবা আরও দ্রুত ও স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

আগামী অর্থবছর থেকেই এই নতুন নীতিমালা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে বোর্ডের। 

প্লেয়ার ডাটা ও ক্লাউড সার্ভার

আগের বিসিবি ম্যাচ সেন্টার নামে একটা এপ থেকে ঘরোয়া লীগের সকল আপডেট পাওয়া যেত যেটা ব্যবহার করে মুহুর্তেই সব জানা যেত।  এখন নতুন করে ঘরোয়া ক্রিকেটের মানোন্নয়নে বিসিবি দুটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করেছে।

বিসিবি প্লেয়ার ডাটা অ্যাপের মাধ্যমে নির্বাচকরা যেকোনো ঘরোয়া ক্রিকেটারের পরিসংখ্যান এক নিমিষেই হাতের নাগালে পাবেন।
 
বিসিবি ক্লাইড সার্ভার অ্যাপ এই অ্যাপের মাধ্যমে কোচ ও বিশ্লেষকরা ভিডিও ফুটেজ দেখে ক্রিকেটারদের শক্তির জায়গা ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করতে পারবেন, যা জাতীয় দলের পাইপলাইন মজবুত করতে সাহায্য করবে।

অনন্য সম্মাননা

এছাড়া দেশের ক্রিকেটে অবদান রাখা সাবেক তারকাদের সম্মানে বিসিবি প্রথমবারের মতো পেনশন স্কিম চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাবেক খেলোয়াড় এবং ম্যাচ অফিশিয়ালদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি, স্থগিত হয়ে যাওয়া বিসিবি অ্যানুয়াল অ্যাওয়ার্ডস বা বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান পুনরায় শুরু হচ্ছে, যেখানে ক্রিকেটারদের পাশাপাশি ক্রীড়া সাংবাদিকদেরও পুরস্কৃত করা হবে।

সাংবাদিকতায় নতুন উদ্যোগ

ক্রীড়া সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব বাড়াতে বিসিবি একটি বিশেষ স্কলারশিপ বা বৃত্তি কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে ক্রীড়া সাংবাদিকরা উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ পাবেন, যা দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার মানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

বিসিবির এই সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সময়োপযোগী। মাঠের ক্রিকেট এবং মাঠের বাইরের প্রশাসন_ উভয় ক্ষেত্রেই পেশাদারিত্বের এই ছাপ বাংলাদেশ ক্রিকেটকে দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য এনে দেবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।