ভারতীয় সংগীত জগতের কিংবদন্তি আশা ভোসলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুতে সুরের এক স্বর্ণালী যুগের অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন সংগীতপ্রেমীরা। ৮০ বছরের দীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে তিনি ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান গেয়ে উপমহাদেশসহ বিশ্বজুড়ে অগণিত শ্রোতার হৃদয় জয় করেছিলেন।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলিতে বিখ্যাত মঙ্গেশকর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোসলে। তার বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার বড় দুই বোন লতা মঙ্গেশকর ও মীনা খাড়িকার এবং ছোট দুই ভাইবোন উষা মঙ্গেশকর ও হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর। বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ৯ বছর বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব নিতে শুরু করেন তিনি।
সংসারের হাল ধরার জন্য তিনি বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’-এ গান গেয়ে তার সংগীত জীবনের যাত্রা শুরু হয়। তবে শুরুটা তার জন্য সহজ ছিল না। সেই সময়ে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠশিল্পী, যার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করতে আশাকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়।
নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করতে আশা ভোসলে পশ্চিমা ধাঁচের গান শোনা ও চর্চা শুরু করেন। তিনি গজল ও কাওয়ালিতে দক্ষতা অর্জন করেন এবং ধীরে ধীরে নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠশৈলী গড়ে তোলেন। যেখানে লতা মঙ্গেশকর ছিলেন মূলত শান্ত ও আবেগঘন চরিত্রের গানগুলোর কণ্ঠ, সেখানে আশা ভোসলে হয়ে ওঠেন আধুনিক ও প্রাণবন্ত গানের প্রতীক। হেলেনের নাচের গান থেকে শুরু করে ‘ও হাসিনা জুলফনওয়ালি’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’ এবং ‘চুরা লিয়া হ্যায়’-এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান তার কণ্ঠে নতুন মাত্রা পায়।
দুই বোনের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতা নিয়ে বহু আলোচনা থাকলেও আশা ভোসলে সবসময়ই সম্পর্কের উষ্ণতার কথা বলেছেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, রক্তের সম্পর্ক সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং তাঁদের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না।
আশা ভোসলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি পরিবারের অমতে ব্যক্তিগত সচিব গণপতরাও ভোসলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে সেই সংসার সুখের হয়নি। দীর্ঘদিন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পর তিনি তিন সন্তানকে নিয়ে ১৯৬০ সালে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে তিনি খ্যাতিমান সুরকার আর.ডি. বর্মণকে বিয়ে করেন।
ব্যক্তিগত জীবনের নানা কষ্ট সত্ত্বেও তার সংগীতজীবন কখনো থেমে থাকেনি। তিনি সবসময় নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। বয়স বাড়লেও তার কণ্ঠের আবেদন কমেনি। ৬২ বছর বয়সে ‘রঙ্গিলা’ ছবির গান গেয়ে তিনি আবারও সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে ঐশ্বরিয়া রায়, কারিশমা কাপুরসহ নতুন প্রজন্মের নায়িকাদের জন্যও তিনি একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দেন।
শুধু চলচ্চিত্রের গানেই নয়, ১৯৯০-এর দশকে পপ সংগীতেও তিনি সফলতা অর্জন করেন। লেসলি লুইসের সঙ্গে তার ‘জানাম সমঝা করো’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বয়সের কোনো সীমা না মেনে তিনি ৭৮ বছর বয়সে অভিনয় শুরু করেন এবং ৮৪ বছর বয়সে ইউটিউব চ্যানেল খুলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত হন।
২০১১ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ও.পি. নায়ার, এস.ডি. বর্মণ, আর.ডি. বর্মণ থেকে শুরু করে এ.আর. রহমান পর্যন্ত বহু প্রখ্যাত সুরকারের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন।
আশা ভোসলে নিজেকে সবসময় ‘চলচ্চিত্র জগতের শেষ মুঘল’ বলে অভিহিত করতেন। তার দীর্ঘ জীবনের স্মৃতিতে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীত জগতের বহু ইতিহাস, গল্প ও পরিবর্তনের সাক্ষ্য জমা ছিল।
জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতা, ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট এবং পেশাগত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তিনি কখনো থেমে যাননি। বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে অনেকটাই অভিভাবকহীন অনুভব করতেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীত জগতের এক গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তবে ২০টিরও বেশি ভাষায় গাওয়া তার হাজারো কালজয়ী গান তাকে চিরকাল শ্রোতাদের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখবে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!