বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক।   ছবি: সংগৃহীত

মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এবারও অপরিবর্তিত থাকছে নীতি সুদহার। আগামী ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ২০২৫–২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি–জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারা বজায় রাখা হবে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। দীর্ঘদিন মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দুই মাসে তিন দফায় ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ করা হয়। ওই বছরের নভেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পরের মাস থেকে কমতে কমতে গত অক্টোবরে তা ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নামে। সেখান থেকে আবার বেড়ে নভেম্বরে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে আরও বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নীতিনির্ধারণী আলোচনায় ১০ শতাংশ নীতি সুদহার বা রেপো রেট অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। মুদ্রানীতির কোর কমিটির বৈঠকেও একই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনার চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। সে কারণে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মতো কোনো শিথিল নীতির পথে আপাতত যাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানা গেছে, শুধু রেপো হার নয়—সুদের হার করিডরের অন্যান্য সূচকেও বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) সর্বোচ্চ হার, স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) সর্বনিম্ন হার এবং ওভারনাইট রেপো হারও প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। এর ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে যে সুদ পায়, তা কিছুটা কমতে পারে। তবে ব্যাংকঋণের খরচ কমার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের চাপ আপাতত অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে নেমে এলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বস্তি ফিরবে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ হবে এবং কর্মসংস্থানেও গতি আসবে। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো সময় লাগবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সতর্ক অবস্থানকে জোরালো করছে। গত অক্টোবর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। ডিসেম্বরে আরও শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতি উঠে যায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির হার এখনো ৯ দশমিক ১০ শতাংশের কাছাকাছি।

গভর্নরের প্রত্যাশা ছিল, মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নামলে নীতিতে কিছুটা শিথিলতার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় কড়াকড়ি নীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্তেই অনড় থাকতে হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যাংকঋণের গড় সুদের হার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, মুদ্রানীতি প্রণয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া রয়েছে। স্টেকহোল্ডারদের মতামত, বিভিন্ন সমীক্ষা এবং অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করেই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকলেও মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।