আইএমএফ
আইমএমএফ লোগো।   ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার অর্থনৈতিক আকাশে আবারও ভেসে উঠছে এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ২৩ মার্চ রাজধানীতে পা রাখছে—আর সেই সফরকে ঘিরেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ঋণ কর্মসূচি এবং জুনে সম্ভাব্য ১.৩ বিলিয়ন ডলারের পরবর্তী কিস্তি।

এই সফর নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি এক ধরনের ‘পরীক্ষা’। কারণ, অর্থ ছাড়ের আগে সরকারকে দেখাতে হবে—সংস্কারের পথে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে। বিনিময় হারকে আরও বাজারভিত্তিক করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা—এই চারটি বড় ক্ষেত্রেই আইএমএফের নজর এখন সবচেয়ে বেশি।

এই প্রেক্ষাপটে, আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন-এর নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে। তাদের সফরের আগেই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। আইএমএফের আবাসিক প্রতিনিধি ম্যাক্সিম কৃষকো  ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী অর্থমন্ত্রী আমির খাসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশের গভর্নর মোঃ মোস্তাকুর রহমান-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

ঢাকা সফরের সময় প্রতিনিধিদল বৈঠক করবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে। সেই বৈঠককে ঘিরে প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি, কারণ এখানেই মূলত নির্ধারিত হবে—নতুন সরকার কতটা দৃঢ়ভাবে এই সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চায়।

বাংলাদেশের জন্য এই ঋণ কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। শুরুতে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই প্যাকেজ পরে বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে। সাত কিস্তিতে অর্থ ছাড়ের পরিকল্পনা থাকলেও, ইতোমধ্যে প্রায় ৩.৬৫ বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে। তবে গত বছরের নভেম্বরের পর থেকে নতুন কিস্তি আটকে আছে—কারণ পঞ্চম পর্যালোচনায় কিছু শর্ত পূরণে ঘাটতি দেখা গেছে।

আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এক কথায় ‘মিশ্র’। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে—বাজেট ঘাটতির লক্ষ্য অর্জন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক পরিশোধ বকেয়া কমে আসা। কিন্তু অন্যদিকে বড় উদ্বেগ রয়ে গেছে রাজস্ব খাতে। প্রত্যাশার তুলনায় কর আদায় অনেক কম। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কারের কোনো পূর্ণাঙ্গ কৌশল এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

অর্থনীতির এই বাস্তবতায় বিশ্লেষকরাও সতর্ক। সেলিম রহিম মনে করেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে আইএমএফ কর্মসূচি ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে জাহিদ হোসাইন-এর মতে, নতুন সরকারের সঙ্গে এই আলোচনাই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের পথ—কারণ আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু একটি ঋণ নয়, বরং এটি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার সঙ্গেও জড়িত।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভেতরের হিসাব বলছে, বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা এখনো রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এটি নিচের সারিতে। ফলে ভ্যাট কাঠামো সংস্কার, কর অব্যাহতি সীমিত করা এবং ন্যূনতম কর বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ বিবেচনায় আনা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, মার্চের এই সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের মুহূর্ত। এই বৈঠকগুলোই ঠিক করে দিতে পারে, জুনে নতুন কিস্তির অর্থ কতটা সহজে আসবে, আর তার চেয়েও বড় কথা—বাংলাদেশ কতটা দৃঢ়ভাবে নিজের অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে এগোতে পারবে।