ব্যাংক ঋণে সরকারের বাড়তি নির্ভরতা, বিনিয়োগে চাপের আশঙ্কা।
ব্যাংক ঋণে সরকারের বাড়তি নির্ভরতা, বিনিয়োগে চাপের আশঙ্কা।   ছবি: সংগৃহীত

চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম সাত মাসে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে, যা মোট ঋণের বড় অংশ। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে বিনিয়োগে চাপ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে দেশি-বিদেশি সব উৎস মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশই এসেছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকের তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যায়। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম ঋণ পান, যা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে। এর সঙ্গে সুদের হার বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এমনিতেই কমে আছে।

ব্যাংকঋণ বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মধ্যে রয়েছে একীভূত ইসলামী ব্যাংকে মূলধন সহায়তা, রাজস্ব আয়ের ঘাটতি এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি। গত ডিসেম্বরের শুরুতে ওই ব্যাংকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয় সরকার, যার বড় অংশই ব্যাংক থেকে ধার করা।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়ার কথা ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

তথ্য বলছে, আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৯ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। সে হিসাবে এবার ঋণ প্রায় আটগুণ বেড়েছে। অন্যদিকে, অ-ব্যাংকিং উৎস থেকে ঋণ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চলতি অর্থবছরের সাত মাসে এ খাত থেকে নেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ছিল ২৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে সাত মাসে সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ২৫১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।

ঋণ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে মোট স্থিতিতেও। ২০২৫ সালের জানুয়ারি শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া কমেছে। চলতি অর্থবছরের সাত মাসে এ খাত থেকে নিট ঋণ এসেছে ৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ শতাংশেরও কম। আগের বছর একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ গ্রহণে ভারসাম্য না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও চাপে পড়তে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়বে।