নেতৃত্বশূন্য সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, আস্থাহীনতায় ৭৬ লাখ আমানতকারী।
নেতৃত্বশূন্য সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, আস্থাহীনতায় ৭৬ লাখ আমানতকারী।   ছবি: সংগৃহীত

দুর্বল পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক তিন মাসেও গতি পায়নি। চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) না থাকায় কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে ব্যাংকটি। এতে সেবা ব্যাহত হওয়া, আমানত ফেরত না পাওয়া এবং ‘হেয়ারকাট’ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বরে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল তারল্য সংকট কাটিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা। তবে বাস্তবে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। 

শুরুর দিকে চেয়ারম্যান হন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়ান। এমডি পদও এখনো শূন্য। ফলে প্রশাসকদের মাধ্যমেই চলছে কার্যক্রম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসকদের অনেকের ইসলামি ব্যাংকিংয়ে অভিজ্ঞতা সীমিত। ফলে নতুন ব্যবসা বা নীতিগত সিদ্ধান্তের বদলে ব্যাংকটি চলছে রুটিন কার্যক্রমে। গ্রাহকসেবা ও ঋণ কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে।

এদিকে ‘হেয়ারকাট’ ইস্যু আস্থার সংকট আরও বাড়িয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফা কমানোর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হন আমানতকারীরা। পরে ৪ শতাংশ মুনাফার ঘোষণা এলেও তাতে আস্থা ফেরেনি।

অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, মেয়াদ শেষে আমানত ফেরত পাচ্ছেন না। এমনকি জরুরি প্রয়োজনেও টাকা তোলা যাচ্ছে না। আমানত সুরক্ষার আওতায় ২ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণাও সব ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা। তাদের দাবি, আমানতে কোনো ‘হেয়ারকাট’ চলবে না এবং দ্রুত লেনদেন স্বাভাবিক করতে হবে। ঋণের নামে অনিয়মের দায় আমানতকারীদের ওপর চাপানো যাবে না বলেও জানান তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আমানত ফেরত দিতে একটি বিশেষ স্কিম চালু রয়েছে। এ স্কিমে ধাপে ধাপে টাকা উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে-প্রথমে ২ লাখ টাকা, এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর আরও অর্থ তোলা যাবে। পুরো টাকা তুলতে সময় লাগতে পারে প্রায় ২১ মাস।

সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, গুরুতর অসুস্থদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ তোলার সুযোগ রয়েছে। অন্য ক্ষেত্রে প্রশাসকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আবেদন যাচাই–বাছাই শেষে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হবে।

একীভূত হওয়ার পর ব্যাংকটির কাঠামোগত সমন্বয়ও চলছে। শাখা পুনর্বিন্যাস, অপ্রয়োজনীয় কার্যালয় বন্ধ এবং একক কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ব্যাংকটির কার্যক্রম চালু রাখা হবে এবং অতীতে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংকটে থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে এই ব্যাংক গঠন করে। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটিতে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া আমানতকারীদের সুরক্ষায় আমানত বীমা তহবিল থেকেও অর্থ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।