ভারতে চলমান ভোটার তালিকা সংশোধনের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে এক জুরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অত্যন্ত অস্থিরতার সাথে কাজটি করা হচ্ছে এবং ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালা সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না।
গেল ২৯ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে ভারত জোড়ো অভিযান, পিইউসিএল এবং এনএপিএম আয়োজিত ‘সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার রক্ষা’- বিষয়ক এক জাতীয় সম্মেলনে জুরি সদস্যরা বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিসগড়, তামিলনাড়ু, গুজরাট, গোয়া এবং উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মানুষের অভিজ্ঞতা শোনেন।
সেখানে, নির্বাচন কমিশনের বিএলও-র (বুথ লেবেল কর্মকর্তা) মাধ্যমে পরিচালিত সংশোধন প্রক্রিয়ার কারণে তাদের উপর কী কী প্রভাব পড়ছে তা জানায় সাধারণ মানুষ। একাধিক রাজ্যে বিএলও কর্মকর্তাদের আত্মহত্যা, শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও জেলা কর্মকর্তাদের উদাসীনতা এবং এর প্রতিবাদের কারণে ইতিমধ্যে এই সংশোধন প্রক্রিয়াটি বিতর্কিত হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, হঠাৎ করে নথিপত্র তলব ও তথ্যের অমিল থাকার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাধারণ নাগরিকেরা।
এদিকে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জুরি বোর্ড জানিয়েছে, নথিপত্রের উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ও ২০০৩ সালের ভোটার তালিকার সাথে সংযোগ খোঁজার কারণে সাধারণ নাগরিক বিশেষ করে দরিদ্র, অভিবাসী এবং যাদের স্থায়ী বসত-বাড়ী নেই, তারা চরম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাছাড়া বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে ধর্ম পরিচয়, জীবনযাত্রার মান, অনুপস্থিতি, বয়স এবং লিঙ্গের ভিত্তিতে বহু প্রান্তিক মানুষকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বাদ পড়া মুসলিম ও আদিবাসীরা:
মুসলিম পরিচয়ের কারণে, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ রাজ্যে ভোটারের নাম নিবন্ধনে বাঁধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মুসলিমদের বসতবাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং তাদেরকে ‘অবৈধ বাসিন্দা’ বলা হচ্ছে। আহমেদাবাদের আকবরনগরে একটি মুসলিম বসতি ভেঙে ফেলার পর হাইকোর্ট তাদের পুনর্বাসনের নির্দেশ দিলেও সে আদেশ পালন করছে না বিজেপি-দলীয় যোগী আদিত্যনাথের সরকার। ক্ষমতায় আসার পর থেকে বরাবর-ই মুসলিমদেরকে টার্গেট করে আসছে যোগী আদিত্যনাথ। ২০২২-২৩ সালে ১ লক্ষ ৫৩ হাজার বাড়ি ভেঙে ফেলা হয় বুলডোজার দিয়ে, যার মধ্যে অধিকাংশ বাড়িই ছিল মুসলিম নাগরিকদের। এমনকি প্রয়াগরাজ ও সম্ভালে এর প্রতিবাদ করলে অতি দ্রুত অভিযুক্ত মুসলিমদের বাড়ি ভেঙে ফেলার মতো নজির রয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিয়মবহির্ভূত বুলডোজার অভিযান বন্ধের নির্দেশ দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে এলাহাবাদে মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভাঙাকে আদালত ‘অমানবিক ও অবৈধ’ হিসেবে বর্ণনা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়।
মুসলিদের উপরে এমন বৈষম্যমূলক আচরণ নতুন নয়। ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন গুজরাটের মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর ব্যাপক সহিংসতা হয়, যেখানে প্রায় দুই হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বাবরি মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য একটি ট্রাস্টের হাতে তুলে দেওয়ার মতো বিতর্কিত রায় প্রদান করে সুপ্রিম কোর্ট। ভারতের এমআইএম পার্টির দলীয় প্রধান আসাদু্দ্দিন ওয়াইসি একটি জাতীয় টিভি চ্যানেলে বলেন, ‘আদালতে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য প্রমাণ দাখিল করা হয়নি এবং মসজিদের পক্ষে দাখিলকৃত তথ্যাদি আমলে আনেনি আদালত।’ তিনি কটাক্ষ করে বলেন- ‘যেখানে একজন জাজ আদালতের দেওয়ালে বানর বসে থাকতে দেখে বলে, আমাকে ঐশ্বরিক ভাবে ইশারা দেয়া হয়েছে, সেখানে রায় কেমন হবে আপনারাই বলুন।’
তামিলনাড়ুর মুদুমালাই বনাঞ্চলের আদিবাসীদের মতো অনেক জনগোষ্ঠী সরকারি প্রকল্পের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে ১৫০ জন ভাসমান ভোটারকে ‘বাংলাদেশী’ ও ‘রোহিঙ্গা’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এবং ১৯৮৪ সাল থেকে পূর্বপুরুষের ভোটার হওয়ার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
বাদ পড়া অভিবাসীরা:
মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের অনেকে কৃষি-শ্রমিক কাজের প্রয়োজনে অন্য রাজ্যে থাকায় অনুপস্থিত দেখিয়ে তাদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ তারা ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী ভোটার হওয়ার যোগ্য। এদিকে ছত্তিসগড়ের বস্তার অঞ্চলে নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘সালওযা জুডুম’ এর সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষকে নাম নিবন্ধন ফরম দেওয়া হয়নি। প্রায় ৬৪৪টি গ্রামের ৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সাবেক বিধায়ক মণীশ কুঞ্জাম মন্তব্য করেন, অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীটি রাজ্যে অনেক মানুষের ঘর পুড়িয়ে দেওয়ায় তারা তাদের নথিপত্র হারিয়েছে। বিএলও কর্মকর্তারাও এসব এলাকায় খুব কম যান। ফলে এই অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ ভোটার বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাদ পড়া বস্তিবাসী:
এদিকে তামিলনাড়ুতে মহানগর এলাকার বস্তিতে বসবাসকারী অনেক মানুষ এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছেন এমনকি একটি জরিপে দেখা গেছে মুম্বাই, জলন্ধর ও হায়দারাবাদে উচ্চবিত্ত এলাকার ৭৪ শতাংশ মানুষ তালিকাভুক্ত হলেও বস্তি এলাকার ৫০ শতাংশেরও বেশী মানুষ ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। এ ছাড়া বিহারে ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) ও কেন্দ্রীয় সংস্থা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)-র প্রকাশিত ভোটার তালিকার খসড়ায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে যে, এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় আনুপাতিকভাবে মুসলিম, আদিবাসী এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের বেশী লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
বাদ পড়া নারী :
রাজ্যগুলিতে নারী ভোটারের সংখ্যা কমেছে অস্বাভাবিকভাবে। নারীদের নাম বাদ পড়ার বড় কারণ, নির্বাচন কমিশন শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দেরকে ‘স্বীকৃত আত্মীয়’ হিসাবে মানছে না। ফলে যারা পৈতৃক ঠিকানা ছেড়ে স্বামীর ঠিকানায় এসেছেন তারা সহজে যাচাইযোগ্য আত্মীয় খুঁজে পাচ্ছেন না।
মৃত হিসাবে বাদ পড়া জীবিত মানুষ:
বিহারে জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে ভোটার তালিকা হতে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এদের অধিকাংশই বৃদ্ধ, ফলে তাদের বয়স্ক ভাতা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এভাবে গুজরাটের আহমেদাবাদেও ১ হাজার ২০৬ জনকে মৃত দেখানো হয়েছে।
কয়েক বছর আগে আসামের প্রায় ৪০ লাখ অধিবাসীকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব বাতিল প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। এসব অধিবাসীর বেশিরভাগই মুসলিম।
(সূত্র: দি ওয়্যার, ওয়েস্ট বেঙ্গল এআইআর, এনটিভি, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।)
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!