গাজা, ফিলিস্তিন, হামাস, ইসরায়েল, মানবাধিকার
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও জমি বেদখলকে ত্বরান্বিত করবে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থাগুলো   ছবি: সংগৃহীত

১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো দখলকৃত পশ্চিম তীরে জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করার ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও জমি বেদখলকে ত্বরান্বিত করবে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

প্রায় ছয় দশক পর জমি নিবন্ধন বা জমির স্বত্ব নির্ধারণ (settlement of land title) প্রক্রিয়াটি আবার চালু করা হয়েছে। গত রোববার দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ-এর প্রস্তাব অনুমোদনের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

যদিও সামরিক আদেশের মাধ্যমে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জমি বাজেয়াপ্ত করার হার বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ২০২৫ সালে তা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, তবুও নতুন এই পদক্ষেপ ইসরায়েলকে এমন একটি আইনি পথ তৈরি করে দেবে যা “ফিলিস্তিনিদের জমি বেদখলকে পদ্ধতিগত রূপ দেবে এবং ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাকে আরও পোক্ত করবে”—এমনটাই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে জমি ও আবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বিমকম’।

বিমকম-এর গবেষণা প্রধান মিকাল ব্রায়ার আল জাজিরাকে জানান, জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি ফিলিস্তিনিদের বিশাল অংশের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, অনেকেই তাদের জমি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করেননি বা মালিকানা প্রমাণে ব্যর্থ হতে পারেন।

দখলকৃত পশ্চিম তীরে জর্ডান প্রশাসনের অধীনে (১৯৪৯-১৯৬৭) জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসনের পর চালু ছিল এবং এর আওতায় মোট এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জমি নিবন্ধিত হয়েছিল। ফলে পশ্চিম তীরের প্রায় ৭০ শতাংশ জমি “সম্পূর্ণ অনিবন্ধিত” অবস্থায় রয়ে গেছে, যা মালিকানা নির্ধারণকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে বলে জানান ব্রায়ার।

ইসরায়েল সরকারের এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো আগামী চার বছরের মধ্যে পশ্চিম তীরের অনিবন্ধিত জমির ১৫ শতাংশের স্বত্ব নির্ধারণ করা। এ জন্য তারা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করেছে, একটি প্রশাসনিক ইউনিট গঠন করেছে এবং ২০২৬ সালের বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রেখেছে, যা এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়। ব্রায়ার আরও বলেন, “যাদের জমি নিবন্ধিত, তাদের জন্যও মালিকানা প্রমাণের আইনি মানদণ্ড এতটাই উঁচুতে রাখা হয়েছে যে, অধিকাংশ ফিলিস্তিনির কাছে তা প্রমাণ করার মতো উপযুক্ত নথিপত্র থাকবে না।”

‘পূর্ণাঙ্গ দখলদারিত্ব’ বা অ্যানেক্সেশন

১৯৬৮ সালে ইসরায়েলি দখলদার কর্তৃপক্ষ গাজা ও পশ্চিম তীরে অধিকাংশ জমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয়। ফলে ফিলিস্তিনিদের জন্য বংশপরম্পরায় মালিকানা হস্তান্তর প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এছাড়া, ১৯৪৮-৪৯ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফেলে আসা বাড়িঘরে অনেক আইনি নথিপত্র হারিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। ওই সময় নবগঠিত ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ৭৭ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নেয়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল মিসরের কাছ থেকে সিনাই উপদ্বীপ এবং সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি দখল করে, পাশাপাশি পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায় আধিপত্য বিস্তার করে।

ইসরায়েলি বসতিবিরোধী সংগঠন ‘পিস নাও’ জানিয়েছে, নতুন করে চালু হওয়া এই জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া কার্যত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের “পূর্ণাঙ্গ দখলদারিত্ব” বা অ্যানেক্সেশনের শামিল। ‘পিস নাও’-এর সদস্য হাগিট ওফরান আল জাজিরাকে বলেন, “এটি পশ্চিম তীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইসরায়েলের একটি কৌশল। সরকার এমন সব কাগজপত্র চাইছে যা ব্রিটিশ ম্যান্ডেট বা ১০০ বছর আগের জর্ডান আমলের।” তিনি আরও যোগ করেন, “খুব কম ফিলিস্তিনিই এসব প্রমাণ করতে পারবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জমিগুলো ইসরায়েলের নামে নিবন্ধিত হয়ে যাবে।”

গত মাসে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা বিমকম, ইয়েশ দিন, অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস ইন ইসরায়েল এবং হ্যামোকেড-এর করা একটি পিটিশন খারিজ করে দেয়, যেখানে জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর বিরোধিতা করা হয়েছিল। আদালত সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর রায় দেওয়াকে “অপরিণত” বা সময়ের আগে বলে মন্তব্য করে।

‘সম্পূর্ণ অবৈধ’

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রক্রিয়াটি কীভাবে এগোবে সে বিষয়ে খুব কম তথ্যই প্রকাশ করেছে। তবে দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া জমির স্বত্ব নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে, যার ফলে ফিলিস্তিনিদের জমি বেদখল হয়েছে।

বিমকম-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পূর্ব জেরুজালেমে নিবন্ধিত জমির মাত্র ১ শতাংশের মালিকানা ফিলিস্তিনিদের দেওয়া হয়েছে। বাকিটা ইসরায়েল রাষ্ট্র বা ব্যক্তিগত ইসরায়েলি মালিকানায় চলে গেছে।

এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের কার্যত দখলদারিত্বকে আরও প্রসারিত করেছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়েছিল যে, ইসরায়েলের “জমি ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, জনসংখ্যা স্থানান্তর এবং দখলকৃত অংশকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে করা আইনগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ এবং তা ওই অঞ্চলের মর্যাদা পরিবর্তন করতে পারে না।”

আইসিজে আরও রায় দিয়েছে যে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে (পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা) ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী দখলদারিত্ব বেআইনি এবং তা “যত দ্রুত সম্ভব” শেষ করতে হবে। ব্রায়ার বলেন, ইসরায়েল সরকারের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের সর্বশেষ প্রচেষ্টা। “সরকার তাদের উদ্দেশ্য গোপন করছে না। তারা বসতি সম্প্রসারণ করতে চায় এবং ফিলিস্তিনিদের যতটা সম্ভব ছোট এলাকায় কোণঠাসা করে ফেলতে চায়।”

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই