একটি ফোনকলেই ভেস্তে যায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি সংলাপ
ছয় সপ্তাহের সংঘাতের পর আলোচনার টেবিলে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে শুরু হওয়া এই আলোচনার শুরুতেই অবিশ্বাস আর কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় তেহরান।   ছবি: আরটিএনএন

দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে কোনও চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ বৈঠক। গত ৫০ বছরের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি কোনো সংলাপে বসা। তবে রবিবার সকালে কোনও সমঝোতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার ঘোষণা দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর নিশ্চিত করে।

বৈঠক শেষে জেডি ভ্যান্স বলেন, আলোচনা ভেস্তে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ‘খারাপ খবর’। তিনি জানান, তারা একটি চূড়ান্ত ও শ্রেষ্ঠ প্রস্তাব দিয়ে এসেছেন এবং এখন দেখার বিষয় ইরান সেটি গ্রহণ করে কিনা। ভ্যান্সের মতে, আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার পাওয়া, যা এখনও অর্জিত হয়নি।

তিনি আরও জানান, ২১ ঘণ্টার মতো চলা এই আলোচনায় তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন। তবে ট্রাম্প নিজে এ বিষয়ে কিছুটা নির্ভার ছিলেন। মিয়ামিতে একটি কুস্তি প্রতিযোগিতায় (ইউএফসি) যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলো কিনা, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।’

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, তেহরান মনে করছে এখন ‘বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে’। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ‘যৌক্তিক প্রস্তাব’ দিলেও ওয়াশিংটন তা গ্রহণ করেনি। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের সদিচ্ছা ছিল, কিন্তু আগের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে আমরা প্রতিপক্ষকে বিশ্বাস করতে পারছি না।’

তিনি চাঞ্চল্যকর একটি দাবিও করেন। আলোচনা চলার সময় হঠাৎ একটি ফোনকল আসে। আর তাতেই ভেস্তে যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা। এর কারণেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার বৈঠকের পর কোনো সমঝোতা ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়।

ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। তবে বৈঠকের মাঝেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি ফোনকল পরিস্থিতি বদলে দেয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, ওই ফোনকল আলোচনার ফোকাস যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক থেকে সরিয়ে ইসরাইলের স্বার্থের দিকে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে এমন কিছু অর্জনের চেষ্টা করেছে, যা তারা যুদ্ধে করতে পারেনি।

রোববার সকালে জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন। তার আগে সম্ভাব্য সংবাদ সম্মেলনকে “অপ্রয়োজনীয়” বলেও মন্তব্য করেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই আলোচনায় অংশ নিয়েছিল এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অটল থাকবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো নেতানিয়াহুর ফোনকলের বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি।

এই সংলাপ ভেঙে পড়ার ঘটনা এমন এক সময় ঘটলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে বাকি মাত্র নয় দিন। ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের প্রস্তাব তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল।

ইরানের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের ও মিত্রদের জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ এবং মজুদ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের দাবি তোলে—যা তারা প্রত্যাখ্যান করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যর্থতার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আবারও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যদিও তা কিছুটা কমেছিল, এখন আবার দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের জোট ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই কূটনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।