বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট   ছবি: সংগৃহীত

দেশের বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা জোরদারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ১৮৫ পৃষ্ঠার এ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়, সংশ্লিষ্ট দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এটি প্রকাশ পায়।

বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়টি প্রদান করেন। রায়ে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী আদালতের জন্য একটি স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় রায়ের তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছে পুনর্বহাল করা হয়েছে। আদালত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনীগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিদ্যমান মূল বিধান পুনরুজ্জীবিত করেছেন। ফলে বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান এখন থেকে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।

রিটের পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, এ রায়ের ফলে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকবে। একইসঙ্গে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনার মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী হবে।

রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানের অষ্টম ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার নজির অনুসারে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হবে এবং রায় ঘোষণার দিন থেকেই তা কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। আদালত ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৯ ধারার মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন এবং ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর ১৯ ধারায় আনা পরিবর্তন উভয়কেই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে বাতিল ঘোষণা করেছেন।

এ ছাড়া ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালাকেও সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এসব সংশোধনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের অধীনে চলে যাওয়ায় সাংবিধানিক ভারসাম্য ক্ষুণ্ন হয়েছিল।

এর আগে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেনসহ সাতজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে একই বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না এবং কেন বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে না। আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে এ বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়।

রুলের ওপর শুনানি শেষে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। এবার সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার পথ আরও সুস্পষ্ট হলো।

আইন সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এ রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।