গণভোট, প্রধান উপদেষ্টা
‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে সরকার।   ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ৩৪ বছর পর দেশে আবারও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে এই গণভোট আয়োজন করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার এ গণভোটের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এতে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, সরকারের এ ধরনের অবস্থান নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, গণভোটে সরকারের পক্ষ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই। যদিও ইসি স্পষ্ট করেছে, রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—কোনো পক্ষেই প্রচারণা চালাতে পারবেন না।

গণভোটের চারটি মূল প্রশ্ন

গণভোটে জনগণের মতামত নেওয়া হবে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়ে। এর মধ্যে রয়েছে— নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রক্রিয়া, দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণসহ জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন, এবং সনদে উল্লেখ থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক সংস্কার কার্যকর করা।

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠনে তৎপরতা

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এ গণভোটকে রাজনৈতিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছে। ফলে রাজধানীসহ সারাদেশে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীরা মাঠপর্যায়ে নেমে জনমত গঠনে কাজ করছেন। শুধু সরকার নয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলই প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’—উভয় পক্ষেই মত প্রকাশের অধিকার সবার রয়েছে। সরকার কারও প্রচারণা বন্ধ করতে চায় না বলেও তিনি দাবি করেন। তবে মাঠপর্যায়ে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।

এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে কোনো শঙ্কার কারণ নেই। তাঁর ভাষায়, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসা ঠেকাতেই সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

বিএনপি ও এনসিপির অবস্থান

দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, সংস্কারের দাবি তারাই প্রথম তুলেছিল।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারাদেশে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে আসনভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যেসব আসনে দলটির প্রার্থী নেই, সেখানে ২৭০ আসনে বিশেষ অ্যাম্বাসেডর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকারের বিস্তৃত প্রচারণা

অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে সংগঠিত ও বিস্তৃত প্রচারণা চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উপদেষ্টাদের জেলা সফর, সরকারি দপ্তর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যানার, ব্যাংক ও এনজিও পর্যায়ে প্রচার, শিক্ষকদের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার।

বাংলাদেশের আগের গণভোটের ইতিহাস

বাংলাদেশে এর আগে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথম গণভোট হয়। ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের আমলেও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যা নিয়ে বিতর্ক ছিল। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার প্রশ্নে গণভোট হয়, যেখানে বিপুল ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে পড়ে।

এমকে/আরটিএনএন