পলিটেকনিক, ছাত্রশিবির, ছাত্রদল
শিবিরের আহত কর্মীরা অভিযোগ করেন, এ সময় ছাত্রদলের বহিরাগতরাও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে হামলায় অংশ নেয়।   ছবি: আরটিএনএন

রাজধানীর ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-এর লতিফ ছাত্রাবাসে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে; তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সকালে শিবিরের এক কর্মী জানান, নামাজ শেষে হলে ফেরার পথে হলসংলগ্ন এলাকায় কয়েকজন ছাত্রদল সমর্থক তাকে ডেকে নেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তিনি নিজেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। এরপরই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, উপস্থিত কয়েকজন তাকে ও তার ছোট ভাইকে মারধর করেন। ছোট ভাইকে লাথি মেরে ফেলে দেওয়া হয় এবং চেয়ার ভেঙে আঘাত করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর ভাষ্য, তিনি বাধা দিতে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। পরে হলের দিকে দৌড়ে গেলে আরও কয়েকজন তাকে অনুসরণ করে হামলা চালায়।

তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীদের মধ্যে ছাত্রদলের মেহেদী, মিথুন ও আশিক নামে কয়েকজন ছিলেন। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলেও দাবি করেন তিনি। এ সময় ইমরান নামে আরেক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

আহত সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী শান্ত সরকার জানান, তিনি শিবিরের রুমে থাকার কারণে হামলার শিকার হন। তার দাবি, ২০-২৫ জনের একটি দল রাতের আঁধারে রুমে ঢুকে লাইট বন্ধ করে দেশীয় অস্ত্র, ছুরি, লাঠি ও স্টিলের রড দিয়ে নির্বিচারে হামলা চালায়।

তিনি বলেন, ‘আমি তোষকের নিচে লুকিয়ে ছিলাম। পরে তারা চলে গেলে আবার ফিরে আসে। দরজা না খোলায় দরজা ভেঙে আমাকে আঘাত করে। ছুরি আনার কথা বলছিল এবং ভিডিও করে মারার হুমকি দেয়। প্রাণভয়ে আমি দুই তলা থেকে লাফ দিই।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।

আরেক আহত শিক্ষার্থী জানান, প্রথম দফার হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যে আরও ১০০-১৫০ জন জড়ো হয়ে ছাত্রাবাসের একাধিক কক্ষে হামলা চালায়। এতে শিবিরের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও আহত হন।

আহতদের স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েকজনের মাথা, বুক ও শরীরে গুরুতর আঘাত রয়েছে। শিবিরের আহত কর্মীরা অভিযোগ করেন, এ সময় ছাত্রদলের বহিরাগতরাও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে হামলায় অংশ নেয়।

আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম।

শিবির সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রত্যাশা করা হলেও এ হামলা সেই পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান এবং মামলা করার কথা বলেন।

সাদিক কায়েম বলেন, পবিত্র রমজান মাসে এমন সহিংসতা অনাকাঙ্ক্ষিত। তার দাবি, দেশীয় অস্ত্র, হকি স্টিক ও স্টাম্প দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ১৬ জন আহত এবং একজন সংকটাপন্ন। হামলায় বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে তিনি দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে তানভীর বারী-হামিম হাসপাতালে আহতদের দেখতে এসে বলেন, তাদের এক নেতা আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, অল্পের জন্য প্রাণঘাতী ক্ষতি এড়ানো গেছে।

হামিম দাবি করেন, হামলায় একটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীর পাশাপাশি বাইরের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরাও অংশ নিয়েছে। তিনি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান এবং প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীরা নিরস্ত্র ছিল। আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও সুসজ্জিত হামলাকারীদের সামনে টিকতে পারেনি।’

হামলার সময় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, দ্রুত ব্যবস্থা নিলে হতাহতের সংখ্যা কমানো যেত।

ঘটনার পর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছে। কলেজ প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়ন করেছে। হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।