এলএনজি, ভর্তুকি
বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।   ছবি: আরটিএনএন

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার সরাসরি আঘাত এসে পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

এই প্রেক্ষাপটে এপ্রিল মাসেই প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা কেবল একটি সংখ্যাগত তথ্য নয়; বরং এটি জ্বালানি খাতের গভীর সংকটের প্রতিফলন। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)–এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে গিয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে দ্বিগুণ বা প্রায় তিনগুণ দামে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের দাম ছিল ১০–১১ ডলার, এখন তা বেড়ে গড়ে ২১ ডলারে পৌঁছেছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ২৮ ডলার ছাড়িয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনও বহুলাংশে আমদানিনির্ভর এবং স্পট মার্কেটের ওঠানামার প্রতি সংবেদনশীল। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজির সরবরাহ সীমিত হওয়ায় সংকটকালীন সময়ে বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক অস্থিরতা যত বাড়ছে, দেশের জ্বালানি ব্যয় তত অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

এই সংকটের আরেকটি মাত্রা হলো চাহিদার ঊর্ধ্বমুখী চাপ। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিশেষ করে কৃষিখাতে সারের উৎপাদনের জন্য গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। সামনে কৃষি মৌসুমে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে এলএনজি আমদানির পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। অর্থাৎ, সরবরাহ সংকটের সঙ্গে চাহিদা বৃদ্ধির দ্বৈত চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নীতিনির্ধারণের দিক থেকেও পরিস্থিতি বেশ সংবেদনশীল। এলএনজি আমদানি এখন পুরোপুরি সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। ভর্তুকি কমানো হলে আমদানি কমবে, ফলে গ্যাস সংকট তীব্র হতে পারে; আবার ভর্তুকি বাড়ালে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে এবং তা সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। এই দ্বন্দ্বমূলক অবস্থাই বর্তমানে জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তা এই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। তাঁর মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সংকট আরও গভীর হবে এবং বাংলাদেশের মতো সীমিত আর্থিক সক্ষমতার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। এটি কেবল একটি স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি সংকট নয়; বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রভাবে উদ্ভূত একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধ শেষ হলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়া এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়েই থাকতে পারে। ফলে বর্তমান সংকট সাময়িক হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি কৌশলগত প্রশ্ন সামনে আসে: জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য কতটা বাড়ানো যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিধি কতটা সম্প্রসারণ করা সম্ভব, এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বিনিয়োগ কতটা বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধীরে ধীরে ঝোঁক বাড়ানোও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এলএনজিতে ভর্তুকির এই বিপুল অঙ্ক কেবল একটি আর্থিক হিসাব নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, সরকার কীভাবে স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের পথে এগোয়।