অধ্যাদেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা: দ্রুত রোডম্যাপ চায় মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস
অধ্যাদেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা: দ্রুত রোডম্যাপ চায় মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস   আরটিএনএন

সাম্প্রতিক অধ্যাদেশ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘মানবাধিকার সুরক্ষা ও স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কিত অধ্যাদেশসমূহ: নাগরিক ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন। বৈঠকটির আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাসুদ কামাল, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির এবং এনসিপির জ্যেষ্ঠ আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।

বক্তারা বলেন, ‘পরবর্তীতে উন্নত আইন’ প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা কাঠামো এখনো স্পষ্ট করা হয়নি, ফলে এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তারা আরও উল্লেখ করেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার থেকে সম্ভাব্য পশ্চাদপসরণ হিসেবে দেখছে।

শিশির মনির তার বক্তব্যে বলেন, বিচার বিভাগীয় সচিবালয় সংক্রান্ত আদালতের নির্দেশনার পর তা বাতিলের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগ ও সংসদের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের রায় বহাল থাকা অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

মাসুদ কামাল বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু পাস, ১৫টি সংশোধন, ১৬টি স্থগিত এবং ৪টি বাতিল করা হলেও এসব সিদ্ধান্তের কারণ জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়নি। বিশেষ করে বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং বিচার বিভাগসংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণসংক্রান্ত সংশোধন নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

সামান্তা শারমিন বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি আরও বলেন, সংসদ হতে পারত এমন একটি জায়গা, যেখানে গুম ও হত্যার শিকার প্রায় দুই হাজার পরিবারের বেদনার কথা, আহতদের বর্তমান অবস্থা এবং বিচারহীনতার চিত্র উঠে আসত। কিন্তু বাস্তবে সেখানে রাজনৈতিক কৌশল ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যই প্রাধান্য পাচ্ছে।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়েও সমালোচনা করা হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, এসব সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে, যা নাগরিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। তাদের মতে, মানবাধিকার ও গুমসংক্রান্ত বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, একজন সচেতন নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব অধ্যাদেশ কেবল আইন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। একইভাবে, গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন না থাকলে নাগরিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন না থাকলে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে যায়।

তারা সতর্ক করে বলেন, অধ্যাদেশ বাতিল বা বিলম্বিত হলে তা নাগরিক আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে।

বৈঠকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-অধ্যাদেশগুলোকে ল্যাপস হতে না দিয়ে দ্রুত বিল আকারে সংসদে পাস করা, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সংশোধিত আইন প্রণয়নের রোডম্যাপ প্রকাশ, এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সিভিল সোসাইটি, আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

এছাড়া বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার, এবং নাগরিকদের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বক্তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করে জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন ও চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী রিপোর্টিং জোরদার করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত হতে হবে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার সুরক্ষা- এই তিনটি ক্ষেত্রই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। বক্তারা বলেন, সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সত্যিকার অর্থে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তবে দ্রুত, স্পষ্ট এবং জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা গড়ে ওঠে আইনের মাধ্যমে; আর সেই আইন যদি অনিশ্চয়তায় থাকে, তবে গণতন্ত্রও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।