জাতীয় সংসদের অধিবেশন
জাতীয় সংসদের অধিবেশন   ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিচার বিভাগের কাঠামো ও নিয়োগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করা হয়। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

এই আইন পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া আবার আগের সাংবিধানিক কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর বিচারক নিয়োগে আলাদা কোনো আইন আর থাকছে না; সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে বিচারক নিয়োগ দেবেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—বিশেষ করে ২৫ জন বিচারকের নিয়োগ—সেগুলো বৈধ বলেই গণ্য হবে।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় এই সচিবালয়ও বিলুপ্ত হচ্ছে। এর অধীনে থাকা বাজেট, প্রকল্প ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এখন সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত হবে। সচিবালয়ের জন্য সৃষ্ট পদগুলো বিলুপ্ত হবে এবং সেখানে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা আগের আইনি কাঠামোর অধীনে ফিরে যাবেন।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি নতুন কাঠামো চালু করেছিল। সেই ব্যবস্থায় ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন করে বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই কাউন্সিল বিচারক নিয়োগের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করত। একইসঙ্গে অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

কিন্তু নতুন করে এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল হওয়ায় সেই কাঠামো আর কার্যকর থাকছে না। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আবার আগের মতো নির্বাহী বিভাগের আওতায় ফিরে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন।

বিল দুটি পাসের সময় সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং এটি বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা। বিশেষ করে নিম্ন আদালতকে প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণের পুরোনো চর্চা আবার ফিরে আসতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান সংসদে বলেন, এই বিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন এবং এটি অসাংবিধানিক। তিনি দাবি করেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকার কথা ছিল। তাই এই বিল পাস করা হলে তা সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

অন্যদিকে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের অভিযোগ ছিল এবং নতুন অধ্যাদেশ সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল। সেই প্রক্রিয়া বাতিল করা হলে আবার আগের সমস্যাগুলো ফিরে আসতে পারে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই সমালোচনার জবাব দেন। তিনি বলেন, সরকার বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং ভবিষ্যতে আরও পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সুসংগঠিত আইন প্রণয়ন করা হবে। তাঁর মতে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তাই তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।

আইনমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, অতীতে বিচার বিভাগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ থাকলেও সরকার একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। এ জন্য নতুন করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংসদে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে বিরোধী দলের সব আপত্তি নাকচ হয়ে যায় এবং বিল দুটি পাস হয়। এখন রাষ্ট্রপতির সম্মতি ও গেজেট প্রকাশের পর এগুলো আইনে পরিণত হবে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের কাঠামো, বিশেষ করে বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় আবার একটি বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করবে নাকি নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।