ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘জুলাই সনদ ও সংস্কার: নতুন বাংলাদেশ নাকি পুরোনো ফ্যাসিবাদ’ শীর্ষক সংস্কার আলাপের দ্বিতীয় পর্বে সংবিধান সংস্কার, গণভোটের বৈধতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও মতবিরোধ সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টায় ডাকসু প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ আলোচনায় দেশের সংবিধান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণভোট এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, শিক্ষক ও বিশ্লেষকরা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভাপতি অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনিম, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এবং দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব আহাম্মদসহ অনেকে।
আলোচনায় সংবিধানের মৌলিক দর্শন ও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, সংবিধান কেবল আইনের ধারার সমষ্টি নয়; এর একটি মূল চেতনা রয়েছে, যা উপেক্ষিত হলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গণভোট ও সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বৈত অবস্থান জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, জুলাই অভ্যুত্থান একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সম্ভাবনা তৈরি করলেও কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া সেই সম্ভাবনাকে সংকুচিত করছে।
অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনিম বলেন, বর্তমান রাজনীতিতে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটলেও জুলাই আন্দোলন নতুন প্রজন্মকে ইতিবাচক রাজনীতির ধারণা দিয়েছে। তিনি সংবিধান “সংশোধন” নয়, বরং “সংস্কার”-এর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তার ভাষায়, বিদ্যমান কাঠামোতে ত্রুটি থাকলে তা জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। উচ্চকক্ষের অনুপস্থিতি, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার প্রবণতা একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে তার রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের মূল চেতনা পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রতিফলিত করা জরুরি। অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের রায়কে গুরুত্ব না দিলে একই ধরনের সংকট পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব আহাম্মদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার মতে, দেশে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, ফলে নির্বাচন প্রভাবিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখতে না পারলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, আপার হাউস গঠন এবং কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সাম্প্রতিক গণভোটে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে একটি শক্তিশালী ম্যান্ডেট দিয়েছে। তার মতে, তরুণ সমাজই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি এবং তাদের নেতৃত্বেই রাজনৈতিক রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাতিলের উদ্যোগ উদ্বেগজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, সংসদ নয়, জনগণই প্রকৃত সার্বভৌম এবং সংবিধানের অধীনেই সংসদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। তিনি রাজনৈতিক দ্বিচারিতার সমালোচনা করে বলেন, অতীতে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নেতারাই এখন তা অস্বীকার করছেন। বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পারিবারিকীকরণের প্রবণতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আমার বাংলাদেশ পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছিল, পরবর্তী সংবিধানে তা পুরোপুরি রক্ষা পায়নি। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বারবার জনগণের প্রত্যাশা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং বর্তমানেও গণভোটের ম্যান্ডেটকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলছে। তার মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে নতুন সংকট সৃষ্টি হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, সাম্প্রতিক গণভোটে জনগণের অংশগ্রহণ ও সমর্থনের হার অতীতের তুলনায় বেশি হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা শক্তিশালী। তিনি বলেন, সংসদ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়; সংবিধান ও জনগণই সর্বোচ্চ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করে আইন পরিবর্তনের উদ্যোগকে তিনি বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যা দেন এবং এ ধরনের পদক্ষেপ বিচার বিভাগ ও সংসদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেন।
সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, এই সংস্কার সংলাপের মূল উদ্দেশ্য ছিল অংশগ্রহণমূলক আলোচনা তৈরি করা এবং বিভিন্ন মতকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা। তিনি দাবি করেন, বিএনপিপন্থী অনেককে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা এতে অংশ নেননি। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা গ্রহণ করে রাষ্ট্র সংস্কারে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে এবং সেই ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব। একটি ন্যায়ভিত্তিক, শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রয়োজন হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান উদ্দীন। এতে ডাকসুর বিভিন্ন সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। আলোচনা শেষে আমন্ত্রিত অতিথিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন ডাকসুর নেতৃবৃন্দ।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!