হাদি
শাহবাগ চত্বর   ছবি: আরটিএনএন

কয়েকটি মুহূর্তের সমষ্টিই একটি মানবজীবন। জন্মের পর অধিকাংশ মানুষ সাধারণ জীবনের চক্র পেরিয়ে কবরেই তাদের গল্পের ইতি টানে। কিন্তু কেউ কেউ এই সীমিত সময়ের মধ্যেই কালকে অতিক্রম করে কালান্তরে জায়গা করে নেয়। প্রজন্ম পেরিয়ে প্রজন্ম, শতাব্দী পেরিয়ে শতাব্দী—মানুষ তাদের স্মরণ করে। সেই বিরল শ্রেণীতেই মাত্র ৩২ বছরের জীবনে নিজের নাম স্থায়ীভাবে খোদাই করে গেছেন শরিফ ওসমান হাদি।

স্বাধীনতার দ্বিতীয় সংগ্রাম হিসেবে পরিচিত জুলাই আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন এই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ক্ষমতার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজধানীর রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলন সংগঠিত করতে তিনি ছিলেন অগ্রসারির কণ্ঠ। ৩৬ জুলাইয়ের পর অনেকের মতো তিনিও চাইলে ঘরে ফিরে যেতে পারতেন—নিরাপদ, নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে। চাইলে রাজনৈতিক পপুলিজমের পথে হেঁটে সুবিধাবাদও বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু হাদি সে পথ নেননি।

স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি মনোযোগ দেন স্বাধীনতাকে পরিপক্ব করা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে। সেই লক্ষ্য থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। টিএসসি ও শাহবাগকেন্দ্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দর্শন—দেশ গঠনে আধিপত্যবাদমুক্ত, দেশীয় সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব।

কর্মীসংখ্যা কম হওয়ায় শুরুতে এই উদ্যোগগুলো গণমাধ্যমের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। তবে লক্ষ্য, গভীরতা ও কাঠামোর দিক থেকে কর্মসূচিগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় এনে প্রতিষ্ঠিত টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কাভারেজের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্য গণমাধ্যমকেও ইনকিলাব মঞ্চের কার্যক্রম তুলে ধরতে উৎসাহিত করা হয়।

কারণ আন্দোলনের মূল্যায়ন কর্মীসংখ্যা দিয়ে নয়, বরং তার লক্ষ্য ও দর্শন দিয়ে হওয়া উচিত। কিন্তু এটাও সত্য—একটি পক্ষ শুরু থেকেই হাদির বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডকে ‘মব’, ‘উশৃঙ্খলা’, ‘উগ্রতা’ কিংবা ‘উস্কানি’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত হাদির সততা, দৃঢ়তা ও দেশপ্রেমের কাছে সেই অপচেষ্টা টেকেনি।

ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান, দেশীয় দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ—সবকিছুর পাশাপাশি সংস্কারের লক্ষ্যে সংসদে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন হাদি। কিন্তু জুলাইবিরোধী গোষ্ঠীর কাছে তিনি ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছিলেন। নির্মম বুলেটের মাধ্যমে তাকে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো।

তবে তারা হয়তো ভাবেনি—জীবিত হাদির চেয়েও শহীদ হাদি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন। তার রক্তের বিনিময়ে জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধাদের পাশাপাশি নানা রাজনৈতিক দল এক ছাতার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। যে আকাঙ্ক্ষা ম্লান হয়ে যাচ্ছিল, তা আবার স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠেছে।

ইনকিলাব মঞ্চের প্রথম দিকের কর্মসূচি কাভার করতে গিয়েই হাদির সঙ্গে পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই হিসেবে তাকে স্নেহ করার এক অদৃশ্য দায়ও এসে পড়ে। একদিন একটি প্রোগ্রামের নিউজ লিংক পাঠানোর পর ফোন করে চা খাওয়ার আড্ডার কথা বলেছিল সে। কিন্তু দুজনেরই ব্যস্ততায় সে আড্ডা আর হয়ে ওঠেনি।

আমার চাকরি হারানোর খবরে হাদি ভীষণভাবে মর্মাহত হয়েছিল—কথা বলতে গিয়ে যেন কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ। সম্ভবত সে তখনও উপলব্ধি করছিল, ফ্যাসিবাদের দূষণ থেকে দেশ এখনো পুরোপুরি মুক্ত হয়নি।

শহীদ হওয়ার আগের শুক্রবার ইস্কাটন গার্ডেনের স্টাফ কোয়ার্টার মসজিদে জুমার নামাজ শেষে দেখি মুসল্লিদের মাঝে নির্বাচনী লিফলেট বিতরণ করছে শরিফ ওসমান হাদি। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “দোয়া করবেন ভাই।” আমি নতুন অফিসের কথা বললে একদিন আসার কথাও দিয়েছিল।

কিন্তু সেই আসা আর হলো না।

শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে বহু আকাঙ্ক্ষিত শহীদি মৃত্যু বরণ করল হাদি। তবুও একসঙ্গে চা খাওয়ার আশাটা আমি ছাড়িনি।

বেহেশতে মনের সুখে উড়ে বেড়াস, ছোট ভাই। ইহজীবনে আমার অধ্যায়ের শেষ হলে পরপারে আবার দেখা হবে। তখন কিন্তু চা খাব, একসঙ্গে আড্ডা দেব—ঠিক আছে?

অরণ্য গফুর
নির্বাহী সম্পাদক, আরটিএনএন
সাবেক সিনিয়র রিপোর্টার, আরটিভি