তারেক রহমান
তারেক রহমান।   ফাইল ছবি

ময়টা ২০০১ থেকে ২০১০। যারা তখন কৈশোরে পা দিয়েছিল কিংবা টগবগে তরুণ ছিল, তাদের কাছে সকালের নাস্তার টেবিলে ‘প্রথম আলো’ ছিল ধ্রুবতারার মতো। সেই সময়ে একটি বিশেষ সংবাদপত্রের পাতায় প্রায় প্রতিদিন একজন মানুষকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ‘খলনায়ক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। তিনি তারেক রহমান।

আজ যখন বাংলাদেশের রাজনীতি এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে, তখন সেই পুরোনো দিনগুলোর দিকে তাকালে অবাক হতে হয়। কীভাবে একটি সুপরিকল্পিত মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে একটি গোটা প্রজন্মের মগজ ধোলাই করা হয়েছিল, তার ব্যবচ্ছেদ হওয়া আজ সময়ের দাবি।

মিডিয়া যখন নিজেই বিচারক

তারেক রহমানকে নিয়ে প্রথম আলো যে বয়ান তৈরি করেছিল, তার মূল অস্ত্র ছিল কিছু মুখরোচক তকমা— ‘মিস্টার ১০ পারসেন্ট’, ‘খাম্বা তারেক’ কিংবা ‘হাওয়া ভবনের রহস্য’। গল্পের মতো করে সাজানো হতো প্রতিটি রিপোর্ট। সাধারণ মানুষ, যারা তখন সিএনজির দাম বাড়া নিয়ে বিরক্ত ছিল, তাদের বোঝানো হলো—এই দাম বাড়ার পেছনেও তারেক জিয়ার হাত আছে! অথচ এর পেছনে বিশ্ববাজার বা অর্থনৈতিক কোনো সমীকরণ ছিল কি না, তা তলিয়ে দেখার চেয়ে একজন ব্যক্তিকে টার্গেট করা ছিল অনেক সহজ এবং মুখরোচক।

২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা নিয়ে যখন তদন্ত চলছিল, তখন আইনি প্রক্রিয়ার আগেই মিডিয়ায় তাকে ‘জঙ্গিবাদের মদদদাতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক মরিয়া চেষ্টা দেখা গিয়েছিল। অথচ আজ যখন ইতিহাসের পাতাগুলো উল্টানো হচ্ছে, তখন প্রশ্ন জাগে—সেই সময়ের সেই রিপোর্টগুলো কি সাংবাদিকতা ছিল, নাকি কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের রাজনৈতিক প্রজেক্ট?

একটি প্রজন্মের মগজ ধোলাই

২০০১–২০১০ সময়কালের সেই তরুণরা আজ সমাজের মধ্যমণি। এই প্রজন্মের একটি বড় অংশের মনে তারেক রহমান সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তা কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাজাত নয়; বরং তা ছিল সম্পূর্ণ ‘মিডিয়া কনস্ট্রাকটেড’। হাওয়া ভবনকে এমনভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল যেন সেটি কোনো রূপকথার ভিলেনের দুর্গ। অথচ তারেক জিয়া তখন তৃণমূলের ক্ষমতায়নে যে কাজগুলো করছিলেন, সারাদেশে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের সাথে মতবিনিময় করছিলেন—তার এক শতাংশ খবরও সেই সময়কার প্রভাবশালী মিডিয়াগুলোতে আসেনি। পজিটিভ ইমেজ তৈরির সব পথ বন্ধ করে দিয়ে শুধু নেতিবাচক বয়ানের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে।

ভোল পাল্টানোর রাজনীতি

সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে এখন। ক্ষমতার পালাবদলে যখন বাতাসের গতিপথ বদলেছে, তখন সেই মতিউর রহমানরাই এখন তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে বড় বড় তাত্ত্বিক লেকচার দিচ্ছেন। যে সংবাদপত্রটি বছরের পর বছর তার ইমেজ নষ্ট করার কারিগর ছিল, আজ তারা ধোয়া তুলসী পাতা সাজার চেষ্টা করছে।

প্রশ্ন হলো, একটি প্রজন্মের কাছে তারেক জিয়ার ইমেজ যে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো, তার দায় কে নেবে? সেই যে কিশোরটি ২০০৫ সালে ‘খাম্বা’র গল্প পড়ে বড় হলো, তার মনের অবচেতনে গেঁথে থাকা সেই বিরূপ ধারণা কি এত সহজে মুছে যাবে? ব্যক্তি ইমেজের যে ক্ষতি প্রথম আলো বা মতিউর রহমানরা করেছেন, তার জন্য কি তারা কখনো ক্ষমা চাইবেন? নাকি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে এই ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’ বা চরিত্রহননের উৎসবকে জায়েজ করে যাবেন?

শেষ কথা

কাঁচ ভাঙলে জোড়া লাগানো যায়, কিন্তু দাগ থেকে যায়। তারেক রহমানের রাজনৈতিক ইমেজ পুনরুদ্ধারের লড়াইটা যতটা না রাজনীতির মাঠের, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক। ইতিহাসের সত্য শেষ পর্যন্ত বের হয়ে আসেই। কিন্তু যে মিডিয়া হাউজগুলো একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য দিনের পর দিন মিথ্যে বয়ান বিক্রি করেছে, তাদের বিচার হবে কোন আদালতে?

তারেক জিয়া কি পারবেন সেই ‘নির্মিত’ খলনায়কের তকমা ঝেড়ে ফেলে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে নিজের প্রকৃত স্থান করে নিতে? সময় হয়তো তার উত্তর দেবে, কিন্তু প্রথম আলোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ইতিহাসের এই ঋণ কখনোই শোধ হওয়ার নয়। তারা শুধু একটি মানুষের ইমেজ নষ্ট করেনি, বরং সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে একটি প্রজন্মের সত্য জানার অধিকার কেড়ে নিয়েছে।

লেখক: এম রহমান, সমাজ কর্মী ও গবেষক