বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ
বিএনপি নাকি জামায়াত, কার পক্ষে যাবে আওয়ামী সমর্থকদের ভোট?   ছবি: সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশটির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই দেশের প্রথম নির্বাচন। তাৎপর্যপূর্ণ এই নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। তবে নির্বাচনে অংশ না নিলেও বিজয়ী নির্ধারণে দলটির সমর্থকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভোটের বাকি আর এক মাসেরও কম সময়। বিভিন্ন জনমত জরিপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো জরিপ বিএনপির বিশাল জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে—যেখানে দেখা গেছে প্রায় ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপিকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং জামায়াতে ইসলামী ১৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বেশ পিছিয়ে আছে। আবার কিছু জরিপ বলছে, লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি, যেখানে বিএনপি সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। মূলত আসন্ন এই নির্বাচনটি মধ্য-ডানপন্থী বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট এবং কট্টর-ডানপন্থী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ইসলামি জোটের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

একসময় রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে বিএনপি ও জামায়াত একসঙ্গে নির্বাচন করেছে। এমনকি ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় জামায়াত নেতাদেরও দেখা গেছে। মূলত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি অভিন্ন শত্রুতা এই দুই দলকে দশকের পর দশক এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক মাঠ থেকে ছিটকে পড়ায় সেই ‘মিত্রতার বন্ধন’ এখন আর কাজ করছে না। গত এক বছরে সাংবিধানিক সংস্কার এবং নির্বাচনের সময়সূচিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দলের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসা এবং ক্ষমতার লড়াই তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পথ আলাদা হওয়াটা অবধারিতই ছিল। এখন সংসদের ৩০০ আসনের দখল নিয়েই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

শুরুতে বিএনপিকে এই দৌড়ে এগিয়ে রাখা হচ্ছিল। দলটির নিজস্ব ভোটব্যাংক বা সমর্থক ভিত্তি গত কয়েক দশক ধরে ৩০-৪০ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। তবে সমস্যাও ছিল। আওয়ামী শাসনামলে দমন-পীড়নের কারণে দলটি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল ও হতাশ হয়ে পড়েছিল। এছাড়া দলীয় প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ছিলেন কারাবন্দি ও অসুস্থ। অন্যদিকে লন্ডনে নির্বাসিত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কিছুটা বিচ্ছিন্ন মনে করা হতো। তাছাড়া, আওয়ামী সরকারের পতনের পর, বিএনপির কিছু নেতাকর্মী লুটপাট ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়লে জনমনে দলটির ভাবমূর্তি কিছুটা ম্লান হয়ে যায়।

তবে ডিসেম্বরের শেষের দিকের কিছু ঘটনাপ্রবাহ বিএনপির পালে হাওয়া দিয়েছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা —নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করেছে। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ — কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি করেনি, বরং দলকে চাঙ্গা করেছে। দেশে ফেরার কয়েক দিন পরই তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু —তারেক রহমান ও বিএনপির প্রতি জনমনে সহানুভূতি সঞ্চার করেছে। আসন্ন নির্বাচনে এই বিষয়গুলো দলটির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ খুব একটা মসৃণ নাও হতে পারে, কারণ জামায়াতে ইসলামীও ক্রমশ শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা, পাকিস্তানের সহযোগিতা এবং যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার ইতিহাস — জামায়াতের জন্য বড় দায়। দলটির তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং রাজপথের শক্তি থাকলেও নির্বাচনে তারা খুব একটা সফল হয়নি।

তবে এবারের চিত্র ভিন্ন হতে পারে। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ভালো ফলাফল করেছে। শহুরে তরুণ সমাজের মধ্যে তাদের সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত শাসন এবং পরিবর্তনের আশায় অপেক্ষমান অনেক বাংলাদেশীর কাছে জামায়াত এখন একটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ —দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তাদের কিছু সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলটির নিজস্ব ভোটব্যাংকও ৩০-৪০ শতাংশের মতো। হাসিনার পতনের পর, তা কিছুটা কমলেও এখনো তা উল্লেখযোগ্য।

নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলে, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা কাকে ভোট দেবেন, সেটাই ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা—যাঁরা মোট জনসংখ্যার ৮-১০ শতাংশ—ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগকেই ভোট দিয়ে আসছেন। বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই এখন এই বিশাল ভোটব্যাংকের দিকে নজর দিয়েছে। হিন্দু ভোটাররা অবশ্য অভিযোগ করছেন যে, তারা উভয় পক্ষের দ্বারাই ভীতির শিকার হচ্ছেন। বিএনপি তাদের সতর্ক করছে এই বলে যে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। অন্যদিকে জামায়াত হুমকি দিচ্ছে যে, ইসলামপন্থীদের ভোট না দিলে তাদের ওপর সহিংসতা নেমে আসবে।

নেতৃত্বের পর্যায়েও বিএনপি ও জামায়াত —আওয়ামী লীগ সমর্থকদের টানতে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। দেশে ফেরার পর, প্রথম জনসমাবেশে তারেক রহমান বাংলাদেশের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ ভিশন তুলে ধরেন, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের নাম উল্লেখ না করেই তিনি ভোটারদের মনে করিয়ে দেন, “১৯৭১ সালে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা (জামায়াত) লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল।”

অন্যদিকে, জামায়াত তাদের স্বাধীনতা-বিরোধী, নারীবিদ্বেষী এবং রক্ষণশীল ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে তারা কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) নিজেদের জোটে ভিড়িয়েছে। একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমেদকে সঙ্গী করে জামায়াত একাত্তরের কলঙ্ক মোচনের আশা করছে। আর ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এনসিপি-কে দিয়ে তরুণ ও প্রগতিশীলদের ভোট টানার পরিকল্পনা থাকলেও দলটির সেক্যুলার অংশ বেরিয়ে যাওয়ায় তা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিএনপি নাকি জামায়াতকে বেছে নেবে, তা নির্ভর করছে —তারা তাদের অতীত কার্যকলাপ কতটা ভুলতে প্রস্তুত, তার ওপর। জামায়াত এখন নিজেদের সংখ্যালঘু বা নারী-বিরোধী নয় বলে দাবি করলেও তাদের প্রার্থী তালিকা কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। আসন্ন নির্বাচনে তাদের তালিকায় মাত্র একজন হিন্দু প্রার্থী এবং কোনো নারী প্রার্থী নেই। অন্যদিকে, তারেক রহমান এখন মধ্যপন্থী ও উদারনীতির কথা বললেও অতীতে তার নির্দেশেই বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়—যা নিয়ে খালেদা জিয়াসহ বিএনপির অনেক মুক্তিযোদ্ধা নেতাও অস্বস্তিতে ছিলেন। বিএনপির প্রার্থী তালিকায়ও মাত্র দুজন হিন্দু রয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সমর্থকদের এখন বিচার করতে হবে ভবিষ্যতের জন্য দুই দলের মধ্যে কোনটি অপেক্ষাকৃত ভালো বিকল্প। বিএনপির ‘নতুন ভিশন’ বা দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো তাদের কিছুটা এগিয়ে রাখবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী সমর্থকরা কি দশকের পর দশক ধরে চলা বিএনপির সঙ্গে তাদের পুরনো বৈরিতা ভুলে যেতে পারবে?

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একে অপরের সরকারকে অচল করে দিয়েছে, রাজপথে এবং নির্বাচনের মাঠে তুমুল লড়াই করেছে। ভাগ্যের পরিহাসে —এখন সেই আওয়ামী লীগ সমর্থকরাই বিএনপির নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছেন। ভোটের দিন তারা কি তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন কিনা —সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র : দা ডিপ্লোম্যাট

আরটিএনএন/এআই