আমলাতন্ত্র
আমলাতন্ত্র সংস্কারের পথেই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।   ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি হওয়ার কথা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের। সংবিধান অনুযায়ী আমলারা হবেন সেই সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের যন্ত্র- সেবক, নিয়ন্ত্রক নন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বারবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়ে গেছে অপরিবর্তিত ক্ষমতার কেন্দ্রে। যেন রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক তারাই। রাজনৈতিক সরকারগুলো আসে যায়, কিন্তু আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব টিকে থাকে অটুট।

এই বাস্তবতা আজ আর গোপন কোনো বিষয় নয়। বরং ক্রমেই তা প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। সম্প্রতি বিসিএস অ্যাডমিন ক্যাডারের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বাসা) নাকি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে- এক অংশ বিএনপি ঘরানায়, আরেক অংশ জামায়াতপন্থী। যদি এই খবর সত্য হয়, তবে এটি শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অবক্ষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সংকেত।

প্রশাসনের কর্মকর্তা মানেই জনগণের কর্মচারী। তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রের পক্ষে সেবা দেওয়া, নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। রাজনীতি করা, রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভক্ত হওয়া কিংবা দলীয় আনুগত্য দেখানো কোনোভাবেই একজন সরকারি কর্মচারীর অধিকার হতে পারে না। বরং এসব আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত।

কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। এখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মত প্রকাশ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় অবস্থান নেন, এমনকি রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করেন। এটি কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কল্পনাও করা যায় না। উন্নত গণতন্ত্রে সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়, কারণ প্রশাসন যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে রাষ্ট্রের সেবা ব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে যায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—৫ আগস্টের পর যে সংস্কারের আশা জেগেছিল, তার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং আমলাতন্ত্র সেই সংস্কারের পথেই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী পুলিশ কমিশন গঠনের কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা হয়নি। কেন হয়নি? কারণ প্রশাসন ক্যাডার চায় না পুলিশের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমুক। তাদের যুক্তি—ডিসি ও ইউএনওদের ক্ষমতা না থাকলে দেশ চালানো যাবে না।

এই যুক্তি শুধু হাস্যকর নয়, ভয়ংকরও। দেশ চালাবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি—মন্ত্রীসভা, সংসদ ও সরকার। আমলাদের কাজ হলো সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। কিন্তু এখানে আমলারা নিজেদের রাষ্ট্রের চালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেন সরকার কেবল নামমাত্র, আর প্রকৃত ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে।

এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে বিএনপির মতো একটি বড় দল যদি আমলাতন্ত্রের এই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাকে সমর্থন করে, তবে তা তাদের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে। আমলাদের তোষণ করে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হলেও সেই ক্ষমতা টেকসই হয় না। ইতিহাস বলে—যে সরকার দলবাজ আমলাতন্ত্রের ওপর ভর করে দাঁড়ায়, শেষ পর্যন্ত সেই আমলাতন্ত্রই তাকে দুর্বল করে ফেলে।

খবরে এসেছে, আটজন ইউএনওর বদলি নিয়ে বিরোধে প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেরাই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন—কেউ বিএনপি ঘরানায়, কেউ জামায়াতপন্থী। প্রশ্ন হলো, বদলি-পদায়ন কি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে হবে? যোগ্যতা, দক্ষতা ও সেবার মান কি কোনো মূল্য রাখে না?

যদি রাজনীতি করতেই ইচ্ছা হয়, তাহলে চাকরি ছেড়ে রাজনৈতিক দলে যোগ দিন। জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে দলবাজি করার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা সরাসরি রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিভিন্ন ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন—এডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন, ব্যাচ কমিটি, তুমুক সমিতি ইত্যাদি। নাম শুনলে মনে হয় এগুলো পেশাগত কল্যাণের জন্য, কিন্তু বাস্তবে এগুলোর মূল কাজ হলো বদলি, পদোন্নতি ও ক্ষমতার বণ্টন নিয়ন্ত্রণ।

এই সংগঠনগুলো কার্যত একটি অদৃশ্য শক্তিকেন্দ্র তৈরি করেছে, যেখানে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও লবিংয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ার নির্ধারিত হয়। যোগ্যতা নয়, আনুগত্যই হয়ে উঠেছে মূল মাপকাঠি। ফলে প্রশাসনে দক্ষতা কমছে, বাড়ছে দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্ব।

রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে সংস্কার চায়, তবে অন্তত একটি কাজ অবিলম্বে করা উচিত—সরকারি কর্মচারীদের সব ধরনের দলীয় বা ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা। প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পেশাদার কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

এটা কোনো প্রতিহিংসা নয়; এটি রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন। কারণ একটি রাজনীতিকৃত প্রশাসন মানেই ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থা।

আমলাতন্ত্রের সমস্যা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সরকার তাদের স্বার্থে আমলাদের ব্যবহার করেছে। কেউ করেছে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে, কেউ করেছে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে। বিনিময়ে আমলারা পেয়েছে অবারিত ক্ষমতা, সুবিধা ও দায়মুক্তি।

এই পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্কই আজ দেশকে এক ভয়াবহ চক্রে বন্দি করেছে। সরকার আমলাদের ছাড় দেয়, আমলারা সরকারের হয়ে কাজ করে। কিন্তু মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ—যাদের সেবা পাওয়ার কথা ছিল।

ফলে জনগণের চোখে সরকার নয়, আমলাতন্ত্রই হয়ে উঠেছে ক্ষমতার প্রতীক। থানায় গেলে ওসি, ইউএনও অফিসে গেলে কর্মকর্তা, ভূমি অফিসে গেলে সার্ভেয়ার—সব জায়গায় মানুষ অনুভব করে, রাষ্ট্র যেন তাদের নয়; রাষ্ট্র যেন কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি।

এই মনোভাব গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। আজ যদি প্রশাসন প্রকাশ্যেই রাজনৈতিকভাবে ভাগ হয়ে যায়, তবে আগামী দিনে কী হবে? এক দল ক্ষমতায় এলে তাদের অনুগত আমলারা দাপট দেখাবে, আর অন্য পক্ষ কোণঠাসা হবে। ক্ষমতা বদলালে পাল্টা প্রতিশোধ চলবে। এর ফলে প্রশাসন আর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থাকবে না—এটি পরিণত হবে রাজনৈতিক যুদ্ধের মাঠে।

এই অবস্থা কোনো রাষ্ট্রের জন্য টিকে থাকার মতো নয়। ইউনূস সরকারের প্রতি প্রত্যাশা ছিল, অন্তত প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আমলাতন্ত্র বরং আরও শক্ত অবস্থানে চলে গেছে। সংস্কারের কথা উঠলেই তারা নানা অজুহাতে বাধা সৃষ্টি করছে। কেউ বলছে নিরাপত্তার কথা, কেউ বলছে প্রশাসনিক সক্ষমতার কথা। কিন্তু মূল ভয় একটাই—ক্ষমতা হারানো।

এই ভয়ই তাদের সংস্কারের শত্রু করে তুলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোরও এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনা করার। আমলাদের সঙ্গে আঁতাত করে সাময়িক লাভ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্র ও দলের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনে। যে আমলাতন্ত্র আজ আপনাকে সমর্থন দিচ্ছে, কাল ক্ষমতা বদলালে তারাই আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের ইতিহাস তার অসংখ্য উদাহরণে ভরা। অতএব প্রশ্নটা আজ স্পষ্ট—রাষ্ট্র চালাবে কে? জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার, নাকি দলবাজ আমলাতন্ত্র?

যদি এই প্রশ্নের উত্তর এখনই ঠিক না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে হয়তো আর ঠিক করার সুযোগই থাকবে না।

কারণ যে রাষ্ট্রে প্রশাসন রাজনৈতিক দলে ভাগ হয়ে যায়, সেখানে গণতন্ত্র কেবল নামেই থাকে। বাস্তবে ক্ষমতা চলে যায় কিছু গুটিকয়েক কর্মকর্তার হাতে -যারা রং বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু নিজেদের কর্তৃত্ব কখনো ছাড়ে না।

এই কাচের ঘরে বন্দি হয়ে আছে পুরো দেশ।

এ কাচ ভাঙার সাহস না দেখাতে পারলে, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও ন্যায়ের সব কথাই থেকে যাবে কাগজে-কলমে।

রাষ্ট্র বাঁচাতে হলে এখনই প্রয়োজন -একটি নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও রাজনীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র। এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট