ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক মাঠ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে—এমন আশঙ্কা নতুন নয়। তবে শেরপুরে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করার ঘটনা সেই আশঙ্কাকে বাস্তব রূপ দিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নতুন করে। নির্বাচনী ইশতেহার পাঠের মতো একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে একজন উপজেলা পর্যায়ের সিনিয়র নেতার মৃত্যু শুধু একটি দলের নয়, পুরো নির্বাচনী পরিবেশের জন্যই উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে।
বুধবার শেরপুরে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। দলটির দাবি, বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এই ঘটনাকে ‘খুন’ হিসেবে উল্লেখ করে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে শুধু ক্ষোভ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা নয় বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। কারণ, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক সংঘর্ষ, হামলা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সামনে এসেছে। ঢাকায় জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম হামলা, চট্টগ্রামের খুলশীতে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, শরীয়তপুরের নড়িয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের সংঘাতে জড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা চোখে পড়ছে।
বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যেই অধিকাংশ সংঘাত ঘটছে বলে মাঠপর্যায়ের তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিরাজগঞ্জ, ভোলা, লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা, নাটোর, নড়াইল—এমন অন্তত ১০টি জেলায় সংঘর্ষ, আহত হওয়ার ঘটনা কিংবা কার্যালয় ও ব্যানার ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও স্লোগান দেওয়া, কোথাও চেয়ারে বসা, কোথাও আবার ফেসবুক পোস্ট—তুচ্ছ কারণ থেকেই বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে পরিস্থিতি।
রাজনীতিতে কথার লড়াই নতুন নয়। তবে এবারের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সেই কথার লড়াই ক্রমেই সহিংসতার দিকে মোড় নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি দোষারোপ এবং মাঠপর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ‘আর দোষারোপের রাজনীতিতে ফিরবেন না’—এমন অঙ্গীকার অতীতেও শোনা গেছে। কিন্তু প্রচারণা শুরু হতেই আবারও সেই পুরোনো ধারার রাজনীতির চর্চা চোখে পড়ছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, ছোট ছোট ঘটনাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন, যাতে নিরাপত্তা ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকট আরও গভীর না হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ, নির্বাচন কমিশন একা সংঘাত ঠেকাতে পারবে না—প্রার্থীরা যদি নিয়ম মানতে অনীহা দেখান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এখনো সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আক্রমণাত্মক প্রচারণা ও ছোটখাটো সহিংসতায় যদি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘যদি মনে হয়, এসব ঘটনায় সহজে পার পাওয়া যায়, তাহলে সহিংসতা বাড়বেই।’
অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নির্বাচন নিয়ে অনেকের মধ্যেই পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রচারণার ধরন, বক্তব্যের ভাষা এবং মাঠের সংঘাত দেখে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতি যেন আবারও ২০০১, ২০০৮ বা ১৯৯৬ সালের পরিচিত পথেই হাঁটছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, সংঘাতের শঙ্কাও তত বাড়ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। শেরপুরে জামায়াত নেতার মৃত্যু সেই শঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই সহিংসতার ধারা কি এখানেই থামবে, নাকি ভোটের দিন পর্যন্ত আরও ঘনীভূত হবে? এর উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তার ওপর।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!