বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার জেলে রিপন মৃধা সকালে পদ্মা নদী থেকে ফিরে বাজারে চোখ বোলাচ্ছিলেন। কিছুদিন আগেও এখানকার দেয়ালগুলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের পোস্টারে ছেয়ে থাকত। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য অতীত। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর আওয়ামী লীগের চিহ্ন এখন প্রায় মুছে গেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এবারের নির্বাচনে ব্যালট পেপারে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক থাকছে না, কারণ দলটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ এবং শেখ হাসিনাকে ১৪০০-এর বেশি মানুষ হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ভোট দেওয়া নিয়ে দ্বিধায় সমর্থকরা
রিপন মৃধার মতো আজন্ম আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এখন চরম দ্বিধায়। নৌকা প্রতীক না থাকায় কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা। তবে ভোটকেন্দ্রে না গেলে ‘আওয়ামী লীগ সমর্থক’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে অনেকে বাধ্য হয়েই ভোট দিতে যাবেন। গত ১৫ বছরে হত্যা, গুম ও নির্যাতনের কারণে দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন চরমে। গোপালগঞ্জের রিকশাচালক সোলাইমান মিয়ার মতো কেউ কেউ অবশ্য ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল। তার মতে, “নৌকা ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে পারে না।”

মাঠছাড়া আওয়ামী লীগ, চাঙা বিরোধীরা
ঢাকার গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন ধ্বংসস্তূপ। সেখানে আশ্রয় নিয়েছে গৃহহীনরা। কার্যালয়ের সামনে ফেরি করে বিএনপির মাফলার বিক্রি করছেন সাগর নামে এক হকার। তিনি জানান, বিএনপির পণ্যের এখন বেশ চাহিদা। অন্যদিকে, স্থানীয় এক হকার আব্দুল হামিদ বলেন, “আওয়ামী লীগের কোনো সমর্থক এখন আর প্রকাশ্যে নেই। এমনভাবে দলটি আগে কখনো হারিয়ে যায়নি।” তবে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আরমান মনে করেন, আওয়ামী লীগ কৌশলগত নীরবতা পালন করছে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই তারা আবার ফিরে আসবে।
ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের জন্য ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, “দলটি নিষিদ্ধ থাকায় তৃণমূলের কর্মীরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী অন্য দলগুলোর সাথে মিশে যাবে। ফলে সমর্থকগোষ্ঠী ধরে রাখা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”
অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক কাঠামো নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির সাথে যুক্ত। তাই দলটি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের থিংক ট্যাংক আইআরআই-এর জরিপে দেখা গেছে, দলটির এখনও প্রায় ১১ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে নির্বাচন
আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুজেলম্যানের মতে, আওয়ামী লীগকে ছাড়া এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নাও হতে পারে। তিনি এই নির্বাচনকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি এও বলেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবারতান্ত্রিক দলগুলোর অস্তিত্ব সহজে শেষ হয় না। বিএনপির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চরম দুর্দিন কাটিয়ে বিএনপি যেমন ফিরে এসেছে, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কুজেলম্যানের মতে, আপাতত আওয়ামী লীগ ‘অপেক্ষার কৌশল’ গ্রহণ করবে। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলে এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে উত্তরসূরি ঘোষণা করলে ভবিষ্যতে দলটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। রিপন মৃধার ভাষায়, “মনে হচ্ছে রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগ যেন পুরোপুরি মুছে গেছে।”
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!