বিএনপি, তারেক রহমান, সরকার, প্রত্যাশা, সংখ্যাগরিষ্ঠতা
জামায়াত আমিরের বাসায় ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় দেখা করতে যান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে তারেক রহমানকে দেখতে এসে একদল শিশু করমর্দন করতে এভাবেই হাত বাড়িয়ে দেয়।   ছবি: আরটিএনএন

দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতীক্ষার পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রায় দুই যুগ পর দলটির এই প্রত্যাবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং প্রশাসনিক কাঠামো, প্রটোকল ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাও বটে। নতুন মন্ত্রিসভার জন্য ৪০টি সরকারি বাসভবন ও অর্ধশত বিলাসবহুল গাড়ি প্রস্তুত রাখার তথ্য সেই বৃহৎ প্রস্তুতিরই অংশ।

রাষ্ট্রক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ হলো সরকারি বাসভবন, প্রটোকল গাড়ি ও আনুষ্ঠানিক শপথ অনুষ্ঠান। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন যাত্রা শুরু হবে। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে প্রশাসনিক এক বিশাল প্রস্তুতি—কোথায় থাকবেন মন্ত্রীরা, কীভাবে চলাচল করবেন, কোন ভবন হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-সংলগ্ন বাসভবন—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করে রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা।

ঢাকার বেইলি রোড, গুলশান, ধানমন্ডি ও মিন্টো রোড এলাকায় প্রায় ৪০টি সরকারি বাসভবন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আগের সরকারের মন্ত্রী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যবহৃত এসব বাড়ি সংস্কার শেষে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী করা হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে; ব্যক্তি বদলায়, কাঠামো টিকে থাকে।

‘যমুনা’: নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র?

নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলেও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’কে প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। বর্তমানে এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-এর বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

‘যমুনা’কে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন করা হলে সেটি কেবল আবাসন পরিবর্তন হবে না; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীকী কেন্দ্রবিন্দুর রূপান্তর ঘটবে। একই সঙ্গে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাংলো একীভূত করে স্থায়ী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন তৈরির পুরোনো সুপারিশও আলোচনায় রয়েছে। তবে তা বাস্তবায়ন জটিল—কারণ এতে সাংবিধানিক পদধারীদের আবাসন পুনর্বিন্যাসের প্রশ্ন জড়িত।

সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর আবাসন প্রশ্নটি প্রশাসনিকের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর ব্যক্তিগত পছন্দ ও নির্দেশনার ওপর।

অর্ধশত গাড়ি: প্রটোকল ও প্রস্তুতি

মন্ত্রিসভার জন্য ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরকে। যদিও মন্ত্রীর সংখ্যা এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবুও ভিভিআইপি প্রটোকল অনুযায়ী অতিরিক্ত গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়—যাতে কোনো দুর্ঘটনা বা যান্ত্রিক ত্রুটির ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা থাকে।

এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটি প্রশাসনিক দূরদর্শিতা—শপথের দিন চাহিদা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, এটি রাজনৈতিক বার্তা—নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত এবং রাষ্ট্রযন্ত্র ইতোমধ্যে সক্রিয়।

জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ শেষে দুই শতাধিক আসনে জয় নিশ্চিত করে বিএনপি সরকার গঠনের পথে। দলটি আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, তারেক রহমানই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে তার বিজয় সেই ঘোষণাকে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে।

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে নীতিনির্ধারণে দৃঢ় অবস্থান দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়িয়ে দেয় জনআকাঙ্ক্ষা। ৪০টি বাড়ি ও ৫০টি গাড়ির প্রস্তুতি প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটালেও জনগণের দৃষ্টি থাকবে—নতুন সরকার কীভাবে অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসনে পরিবর্তন আনে।

মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত বাড়ি ও গাড়ির সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের সংগঠিত প্রক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ। অবকাঠামোগত প্রস্তুতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে নতুন সরকারের নীতি, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সক্ষমতা।

রাষ্ট্রের ভবন ও বাহন প্রস্তুত—এখন অপেক্ষা নীতিগত দিকনির্দেশনা ও কার্যকর নেতৃত্বের। নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে, এই প্রতীকী প্রস্তুতিকে কত দ্রুত বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দেওয়া যায় তার ওপর।