নরেন্দ্র মোদি, নেতানিয়াহু, ভারত, ইসরায়েল
নরেন্দ্র মোদি ও নেতানিয়াহু   ছবি: সংগৃহীত

২০১৭ সালের ৪ জুলাই তেল আবিবের উপকণ্ঠে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিমান অবতরণ করেন। টারমাকের লাল গালিচার অন্য প্রান্তে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন ইসরায়েলি সমকক্ষ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

মিনিটখানেক পরেই দুই নেতা আলিঙ্গন করেন। বিমানবন্দরেই মোদি ঘোষণা করেন, তার এই সফর একটি "যুগান্তকারী যাত্রা"—কারণ এর আগে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েল সফর করেননি। নেতানিয়াহু ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে তাদের প্রথম সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে বলেন, "সেখানেই আমরা ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে অবশিষ্ট দেওয়াল ভেঙে ফেলার বিষয়ে একমত হয়েছিলাম।"

নয় বছর পর, আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি মোদি যখন তার দ্বিতীয় সফরে ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনি সেই মিশন অনেকাংশেই সফল করেছেন। যে সম্পর্ককে ভারতে একসময় বাঁকা চোখে দেখা হতো এবং গোপনে রক্ষা করা হতো, তা এখন নয়াদিল্লির অন্যতম প্রকাশ্য বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময় কথিত যুদ্ধাপরাধের জন্য নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও মোদি তাকে বারবার "প্রিয় বন্ধু" হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ভারতীয় কূটনীতিক ও কর্মকর্তারা ইসরায়েলের দিকে এই ঝুঁকে পড়াকে "বাস্তববাদী বা প্র্যাগম্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গি" হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের যুক্তি, ইসরায়েলের প্রযুক্তি ও সামরিক দক্ষতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে নয়াদিল্লি তাদের আরব মিত্রদের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে ফিলিস্তিনকে, ফিলিস্তিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে এবং কিছু বিশেষজ্ঞের মতে—ভারতের নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও।

নয়াদিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক 'পলিসি পারসপেকটিভস ফাউন্ডেশন'-এর সিনিয়র ফেলো আনোয়ার আলম আল জাজিরাকে বলেন, "ভারতের তথাকথিত বাস্তববাদী মোড় তার নৈতিক শক্তির ক্ষতি করেছে, যা একসময় গ্লোবাল সাউথে ভারত উপভোগ করত।" ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান যুদ্ধের মধ্যে মোদির এই সফর "ইসরায়েলের বর্ণবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার শামিল" বলে মন্তব্য করেন আলম।

আদর্শিক জোট

ঔপনিবেশিকতা-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় ভারত ছিল ফিলিস্তিনের কট্টর সমর্থক। ১৯৪৭ সালে ভারত ফিলিস্তিন ভাগের জাতিসংঘ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল। চার দশক পর, ১৯৮৮ সালে ভারত প্রথম অনারব রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি নয়াদিল্লির সমীকরণে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি ভারত ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে।

এরপর থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাই এই সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতায় আসা দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র আদর্শ ভারতের হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে প্রোথিত—যা অনেক ক্ষেত্রেই ইসরায়েলের নিজেকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। মোদি এবং ইসরায়েল উভয়ই "ইসলামি সন্ত্রাসবাদ"-কে বড় হুমকি হিসেবে দেখে।

মোদির অধীনে ভারত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। আল জাজিরার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় ভারতীয় অস্ত্র কোম্পানিগুলো ইসরায়েলকে রকেট ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেছে। মোদির আসন্ন সফরের আগে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। জেরুজালেমে মোদি ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে ভাষণ দেবেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিভাগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর ম্যাক্স রোডেনবেক বলেন, "মোদির ভাষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি বিজেপির অধীনে ইসরায়েল-পন্থী নীতির দিকে সম্পর্কের মোড় নেওয়ার মাত্রাকে তুলে ধরে।" তবে মোদির এই সফর নেতানিয়াহুর জন্যও ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলে কয়েক মাস পরেই নির্বাচন, যা কার্যত নেতানিয়াহু সরকারের ওপর গণভোটের শামিল।

রোডেনবেক বলেন, "ইসরায়েলি নির্বাচনী প্রচারণার ঠিক আগে মোদির এই সফর নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে তাকে ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করার মতো মনে হচ্ছে।" ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা অনেক নেতা ইসরায়েল সফর করলেও গ্লোবাল সাউথ থেকে খুব কম নেতাই সেখানে গেছেন।

গাজা যুদ্ধের কারণে যখন ইসরায়েলের বন্ধুর তালিকা ছোট হয়ে আসছে, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে—তখন মোদির এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক 'অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন'-এর মধ্যপ্রাচ্য অফিসের নির্বাহী পরিচালক কবির তানেজা বলেন, "বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের খুব বেশি বন্ধু নেই। তাই ভারত সেই ভূমিকা পালন করছে। [মোদির সফর] এক অর্থে দেখাচ্ছে যে ইসরায়েল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়।"

জুলাই ২০১৭-এর সফর

বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, মোদির এবারের সফর অনেক দিক থেকেই তার ২০১৭ সালের জুলাই সফরের ওপর ভিত্তি করে হবে, যা ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক সন্ধিক্ষণ। এর আগে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েল যাননি, এমনকি নিম্ন-পদস্থ কূটনীতিকরাও ইসরায়েল সফরের সঙ্গে ফিলিস্তিন সফর যুক্ত রাখতেন।

মোদি সেই প্রথা ভাঙেন। ২০১৭ সালে তিনি ফিলিস্তিন যাননি, গিয়েছিলেন ২০১৮ সালে—ততদিনে তিনি নয়াদিল্লিতে নেতানিয়াহুকে আতিথ্য দিয়ে ফেলেছেন। সেটিও ছিল কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর। সম্প্রতি জেফরি এপস্টেইন ফাইল প্রকাশের পর ২০১৭ সালের সফরটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত ইমেলে দেখা যায়, প্রয়াত ওই কলঙ্কিত অর্থদাতা মোদির সফরের সময় মোদি-ঘনিষ্ঠ এক বিলিয়নেয়ারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ইমেলে এপস্টেইন লিখেছিলেন: "ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি উপদেশ নিয়েছেন। এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুবিধার জন্য ইসরায়েলে নেচেছেন ও গেয়েছেন... এটা কাজ করেছে!" ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবিগুলোকে এক দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর "বাজে প্রলাপ" বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

তবুও মোদির সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করেছে। ১৯৯২ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল ২০০ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। পণ্যের ক্ষেত্রে চীনের পর ভারতই ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম এশীয় বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি (বিআইটি) স্বাক্ষর করেছে এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও বেড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের নিষিদ্ধ করলে হাজার হাজার ভারতীয় ইসরায়েলি নির্মাণ কোম্পানিগুলোতে কাজের জন্য লাইন দেয়।

দিগন্তের ওপারে কি ভিন্ন মধ্যপ্রাচ্য?

ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও মোদির ভারত ফিলিস্তিন ইস্যু পুরোপুরি ত্যাগ করেনি। তারা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তির আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের সমালোচনা করতে তারা ক্রমশ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

ভারতের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (নন-অ্যালাইনমেন্ট মুভমেন্ট) ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ফিলিস্তিন সমর্থনের শেকড় নিহিত। মহাত্মা গান্ধী ইসরায়েল সৃষ্টির মাধ্যমে "আরবদের ওপর ইহুদিদের চাপিয়ে দেওয়া"র নিন্দা করেছিলেন। ভারত এখন আর তার নীতিকে জোটনিরপেক্ষ বলে না, বরং একে "কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন" (strategic autonomy) বলে অভিহিত করে।

তানেজা বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যই একমাত্র জায়গা যেখানে এই নীতি আসলে কাজ করে এবং লাভ দেয়। ভারতের ইসরায়েল, আরব শক্তি এবং ইরান—সবার সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক আছে। এর অন্যতম কারণ হলো ভারত আঞ্চলিক সংঘাত ও বিবাদে পা দেয় না।" কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপে ভারত ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর উন্নয়নের কাজ গুটিয়ে নিচ্ছে।

এখন ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে যুদ্ধজাহাজ ও বিমান জড়ো করেছে। রোডেনবেক বলেন, "আমার সন্দেহ, ভারত হয়তো এমন এক মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকিয়ে আছে যেখানে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় বিপর্যস্ত এবং আর কোনো শক্তি প্রদর্শন করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল আঞ্চলিক পরাশক্তি বা হেজিমনি হিসেবে আবির্ভূত হবে।"

"ভারত সম্ভবত সেখান থেকে লাভবান হওয়ার অবস্থানে নিজেকে রাখছে। এছাড়া মোদি ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনে প্রভাবশালী মনে করেন এবং আশা করতে পারেন যে ইসরায়েলের প্রতি বন্ধুত্ব কংগ্রেস ও ট্রাম্পের কাছে ভারতের অবস্থান শক্ত করবে, যা ভারতের খুব প্রয়োজন।"

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই