ঋণখেলাপি, গভর্নর
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।   ছবি: আরটিএনএন

দেশের ১৪তম গভর্নর হিসেবে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের পর থেকেই আর্থিক অঙ্গনে আলোচনা তুঙ্গে। সামাজিক মাধ্যমে কেউ তাঁকে ‘ঋণখেলাপি’ বলছেন, কেউ আবার বলছেন—আইনের চোখে এখন আর সে বিষয়টি প্রযোজ্য নয়। তাহলে বাস্তবতা কী?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড-এ ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকার একটি ঋণ একসময় খেলাপি হয়েছিল। গত বছরের এপ্রিলে তিনি বিশেষ সুবিধার আওতায় ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন করেন। পরে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণটি পুনঃতফসিলের অনুমোদন পান।

ব্যাংকিং বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল অনুমোদিত হলে এবং গ্রাহক শর্ত মেনে চললে তাঁকে আর খেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয় না। সে হিসাবে বর্তমানে আইনগতভাবে তাঁকে ঋণখেলাপি বলা যাবে না।

তবে বিতর্ক কেন?

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসায়িক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা চালু করে। ওই নীতিমালার আওতায় একাধিক প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিলের সুযোগ পেয়েছে। ফলে নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসেনি।

তবে আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে নৈতিক মানদণ্ডের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়ে দেখা দেয়। কারণ, যিনি ব্যাংকগুলোর ঋণশৃঙ্খলা তদারক করবেন, তাঁর নিজের ঋণ-ইতিহাস নিয়েও জনমনে স্বচ্ছতার প্রত্যাশা থাকে বেশি।

নিয়োগের দিনই উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ব্যাংক। সকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ, শোকজ ও বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবি, পরে গভর্নরের সংবাদ সম্মেলন—সব মিলিয়ে দিনভর ছিল নাটকীয়তা। এর মধ্যেই সরকারের প্রজ্ঞাপনে নতুন গভর্নর নিয়োগের ঘোষণা আসে। আগের গভর্নরের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন গভর্নরের অতীত ঋণ-ইতিহাস আরও আলোচনায় উঠে আসে।

মোস্তাকুর রহমান তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা। তিনি বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি-এর সদস্য এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশে এই প্রথম একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর করা হলো। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক ছিন্নের শর্তে তাঁকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ঋণ একসময় খেলাপি থাকলেও পুনঃতফসিলের শর্ত পূরণ হওয়ায় বর্তমানে তিনি আইনগতভাবে ঋণখেলাপি নন। তবে নৈতিকতা, সমতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে বিতর্ক থামেনি।

এখন দেখার বিষয়—গভর্নরের আসনে বসে তিনি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও আস্থা কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের ক্ষেত্রে আইনগত অবস্থানের পাশাপাশি জনআস্থাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মূলধন।