ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের ভূমিকম্প পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চলতি মাসের প্রথম ২৬ দিনে দেশে নয়বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে সর্বশেষটি ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ৫১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে। এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১ এবং উৎপত্তিস্থল মায়ানমারের সাগাইং অঞ্চলে। এর মাত্র ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফের ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টা ৪ মিনিট ৫ সেকেন্ডে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম্পন অনুভূত হয়। যদিও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু কম্পন অনুভূত হলেও কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চলে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্পের তালিকা প্রতিদিনই বাড়ছে। ১ ফেব্রুয়ারি সিলেট থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি মায়ানমারে ৫.৯ এবং ৫.২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। একই দিন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। সিলেটের গোয়াইনঘাটে ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ৩.৩ এবং ৪ মাত্রার কম্পন ঘটে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে ছোট মাত্রার ভূমিকম্পের সঙ্গে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা যুক্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসাইন ভূইয়া বলেন, বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান তিনটি টেকটোনিক প্লেট—ইন্ডিয়ান, বার্মিজ এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি। এখানকার নরম শিলাময় মাটির ওপর কম্পন হলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। ছোট কম্পন প্রতিনিয়ত হলেও চার বা তার ওপরে মাত্রার ভূমিকম্প মানুষ সহজে অনুভব করতে পারে এবং ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গত বছরের ২১ নভেম্বর ঢাকাসহ সারাদেশে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনায় ১০ জন নিহত, শতাধিক আহত এবং বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, পূর্বপ্রান্তে বার্মা প্লেট ও পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল দীর্ঘদিন আটকে থাকায় এখন ভূমিকম্পের শক্তি মুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে।
কিন্তু শুধু ভূমিকম্পের মাত্রা বা ভূতাত্ত্বিক কারণই উদ্বেগের বিষয় নয়। বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর। পুরান ঢাকার অংশে সরু গলিপথ, একের ওপর একে তৈরি বাড়ি এবং বহুতল ভবনের মধ্যে সীমিত ফাঁকিপথ থাকায় বড় ভূমিকম্প হলে বিপর্যয় অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে যেতে পারে। নতুন শহরের নির্মাণেও প্রয়োজনীয় ফাঁকা স্থান এবং ভূমিকম্প-সহনীয় নকশা মানা হয় না। নিচু মানের সিমেন্ট, বালির পরিমাণ কম দেওয়া, অপ্রতিষ্ঠিত আয়রন রড ব্যবহার এবং যথাযথ ভিত্তি না থাকা এসব বিষয় বিপদ বাড়ায়।
দূর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা, উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধার অভাব রয়েছে। ফায়ার ব্রিগেড, বিজিবি ও সেনা মহড়া কম, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ, এবং জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার জনশক্তি অপর্যাপ্ত। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিপদ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ অত্যন্ত কম। বিদেশে সামরিক বা অন্যান্য প্রশিক্ষণ নিতে তৎপর হলেও, জীবনরক্ষার সরাসরি প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
তাই বলা যায়, ফেব্রুয়ারির এই ধারাবাহিক ভূমিকম্পগুলো কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি দেশের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবাণী। ভূতাত্ত্বিক কারণে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কঠোর ভবননির্মাণ বিধি, জরুরি প্রস্তুতি এবং জনগণকে সচেতন করার কার্যক্রম অপরিহার্য। যদি এই উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় মোকাবিলা করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!