নারী দিবস, আন্তর্জাতিক
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।   ছবি: আরটিএনএন

আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষকে আল্লাহর পাক সুনিপুণ  সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করে নারী পুরুষের মধ্যে দায়িত্ব দিয়েছেন একজন মাতৃত্বের, একজন পিতার ভূমিকা পালন করবেন। তবে মানুষ হিসেবে পরকালের সাফল্য এক‌ই হবে তার আমলের ভিত্তিতে। জান্নাত প্রাপ্তিতে কার‌ও বৈষম্য করা হবে না।
মহান আল্লাহ পাক পৃথিবীতেও বৈষম্য করেন নি। দুনিয়াতে ছোট বড়, ধনী গরীব, সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটন, নারী-পুরুষ এসব দিয়ে পৃথিবীকে টিকে থাকার এক অনন্য ভারসাম্য সৃষ্টি করেছেন। যা মানুষের দিব্য চোখে দেখা সম্ভব নয় এর সূক্ষ্ম রহস্য। এই রহস্য উন্মোচন করে দিয়েছেন নবী রাসূল পাঠিয়ে গাইড লাইন দিয়ে। সর্বশেষ নবী রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে আল কুরআন পাঠিয়ে। যুগ যুগ ধরে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করলে মানুষ বৈষম্যের শিকার হবে না। দুনিয়া ও আখেরাতে সাফল্য পেতে পারে মানব জাতি। তবে আজ আমরা কি দেখছি? নারীকে নিয়ে যত প্রশ্ন? নারীর অধিকার ও মর্যাদা দিতে গিয়ে মানুষ হিসেবে নারীর যে মর্যাদার কথা ভুলে যাই অনেক সময়। ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। এবার পবিত্র রমযান মাসে নারী দিবস পালিত হচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই কুরআনের আলোকে নারীর মর্যাদা নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু তা কি হবে? তথাকথিত নারীবাদী নারীকে বিভ্রান্ত করতে মাঠে ময়দানে তৎপর।

এবারের প্রতিপাদ্য

এবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ এর প্রতিপাদ্য –”আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার।"
আজকের কন্যা সন্তান আগামীর পরিপূর্ণ নারী। এই কন্যা সন্তান কি সমাজে সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠছে? তাকে কি সমাজ সুন্দর ভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিচ্ছে? অগনিত প্রশ্ন সমাজের সামনে। বিগত সময়গুলো এর সঠিক জবাব যেমন কার্যকর নয়, আগামীতে প্রশ্ন আসবে কারণ বর্তমান সুখকর নয়। তার নমুনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। গত ১৫/২০দিনে ৫০এর অধিক নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে যার মধ্যে ৬ শিশু কন্যার করুণ পরিণতি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে! কোন সমাজে বসবাস করছি? সভ্যতার এ যুগেও!

ক্ষমতার পালাবদল

দেশে দেশে সরকার আসে, সরকার যায়; ক্ষমতার পালাবদল হয়। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। দেশে নতুন সরকার এসেছে, তারপরও নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা থামেনি। একের পর এক ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে, অথচ কোন প্রতিকার নেই। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের ‘সেন্ঞ্চুরী উদযাপন ‘! ২০১৫সালে ২১শে মে কুড়িল বিশ্বরোডে এক গাঢ়ো তরুণী গণধর্ষণ, ২০১৮ সালে নির্বাচনী সহিংসতার প্রেক্ষাপটে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক নারীর গণধর্ষণ, ২০২৫এর মার্চ মাগুরায় বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে আট বছরের আছিয়া ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুর ক্ষত শুকাতে না শুকাতে গত ২৬ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৬ বছরের নিষ্পাপ শিশু তাহিয়াকে যেভাবে গণধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে তা শুধু বর্বরতা নয়, মানবসভ্যতার গায়ে কলঙ্ক লেপন।
এছাড়া নারী ঘরে-বাইরে, অফিসে-আদালতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কোন না কোন ভাবে। এমনকি চাকরিজীবী নারী তার পরিশ্রমের অর্থ নিজে ব্যয় করতে পারে না, স্বামীর হস্তক্ষেপের কারণে।

চাই ন্যায্য অধিকার 

এমনটি হ‌ওয়ার কথা ছিল না। তাহলে কেন এই দুর্দশা নারীর। এর জন্য কি নারী দায়ী? নাকি সমাজের গভীর ক্ষত এর জন্য দায়ী?
প্রতিবছর নারী দিবস আসে, প্রতিপাদ্য নিয়ে আলোচনা, মিছিল, মিটিং, সিম্পোজিয়াম, সবই হচ্ছে তবুও নারী তার অধিকার মর্যাদা ফিরে পাচ্ছে না। নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। নারী ভোগের পণ্য নয়। পূর্ণ অধিকার রয়েছে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার। ”চাই ন্যায্য অধিকার।" মানুষ হিসেবে যতটুকু প্রাপ্য সবটুকু সমাজ যখন নারীকে দিতে পারবে তখনই নারী ফিরে পারে তার মর্যাদা ও অধিকার।
মা, বোন, কন্যা, জয়া এসব নারীর যেমন পরিচয়। পুরুষেরও পিতা, পুত্র, ভাই, স্বামী হিসেবে পরিচয় রয়েছে। কোথাও তাদের অধিকার নিয়ে আলোচনা, মিছিল, মিটিং হয়না। কেন হয়না? পুরুষ বলে কি? আজ যদি সমাজে পিতার দায়িত্বে, পুত্রের করণীয়, ভাইয়ের ভূমিকা, স্বামীর দায়িত্ব এগুলোর ব্যাপক আলোচনা, মিছিল, মিটিং, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে হতো তাহলে নারী তার সত্যিকার মূল্যায়ন পেত। মূলতঃ মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ উভয়েই আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব রয়েছে। সে দায়িত্ব থেকে সরে আসার কারণে আজ সমাজে এত অরাজকতা। মহান আল্লাহ বলেন, “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদের ওপরই আল্লাহ রহমত নাজিল করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়" [সূরা তাওবা:৭১)। ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে। উত্তরাধিকার, দেনমোহর থেকে শুরু করে উপহার প্রদান পর্যন্ত সকল সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর যে অধিকার রয়েছে সেটা যদি সমাজে সুষ্ঠু বন্ঠন হতো তাহলে নারী তার ন্যায্যতা পেত। তেমনি স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসা এসব থেকে আজ নারী-পুরুষ উভয়েই বঞ্চিত। তবে কন্যা সন্তানকে স্নেহ, মমতা, ভালোবাসার চোখ দিয়ে দেখতে হবে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে। লালসার চোখকে শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। বিচারহীনতা আজ অধঃপতনের অন্যতম কারণ।

ইতিহাসের পাতায় 

সেই সুদূর অতীত থেকে আজ অবধি নারী অধিকার ও মর্যাদা ফিরে পেতে কত লড়াই করে এসেছে তবুও কি ফিরে পেল অধিকার মর্যাদা? ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ নারী দিবস উদযাপন শুরু করে এবং ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮ মার্চ দিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এভাবে প্রতিবছর নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে। নারীর প্রকৃত মর্যাদা অধিকার ফিরে পেতে হলে ইতিহাসের পাতায় সোনালী যুগের ফিরে যেতে হবে। রাসূল (সা.) যেভাবে নারী অধিকার ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তার অবদান আজ‌ও আছে। যদিও তথাকথিত নারীবাদী এসব শিকার করেন না। রাসূল (সা.) এর পথেই নারী ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করে।

 প্রয়োজন 

*নারীর প্রকৃত মর্যাদার সঠিক মূল্যায়ন: এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে পাঠ্যক্রমে নারী শিক্ষা গুরুত্ব তুলে ধরা 
*নারীর অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান প্রদান।
*অর্থনীতি মুক্তি নারীর একমাত্র মুক্তি নয়।’ এ ধারণার বিপরীতে নারীর সামগ্রিক অধিকারের ব্যাপারে সমাজের সচেতন গোষ্ঠীসমূহকে সোচ্চার হ‌ওয়া।
*নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য, মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা এসব কিছু ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের ভূমিকা যথাযথ হ‌ওয়া।
*কন্যা শিশুসহ নারীর ঘরে বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও প্রিন্সিপাল, সাবাহুন নূর একাডেমি , টঙ্গী, গাজীপুর।