ইরান যুদ্ধের জের ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পেট্রল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন জায়গায় তেলের জন্য পাম্পের সামনে যানবাহনের লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় পেট্রল পাম্পের ভিড়ের ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকে কয়েক ঘণ্টা ধরে লাইনে অপেক্ষমাণ থাকার পর তেল সংগ্রহ করতে পারছেন। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, এই সুযোগে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে এক শ্রেণির অসাধু পাম্প মালিক।
বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা সরবরাহের অভাবে হয়নি; এটা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে যে সংকট তা আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের জন্যই তৈরি হয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুসারেও বন্দরে এবং ডিপোতে যথেষ্ট পরিমাণ তেল মজুদ রয়েছে। তারপরও পাম্প পর্যায়ে তেল না থাকার বিষয়টি সত্যিই সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ জনগণ মনে করছে, গোপন ‘সিন্ডিকেট’ পরিকল্পিতভাবেই এই ‘ক্রাইসিস’ তৈরি করে বাড়তি মূল্য হাঁকিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে। অনেকে এটিকে সংকট মানতেও নারাজ। একদল মনে করছে, সরকারের ভেতরই লুকিয়ে আছে এই গোপন ‘সিন্ডিকেট’ এর লোকজন। যারা পাম্পে তেল না থাকার গুজব ছড়িয়ে মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে বলে জানিয়েছে। বাংলাদেশের জাহাজসহ ছয়টি “বন্ধুরাষ্ট্রের” জাহাজ নিরাপদে চলাচলের অনুমতিও দিয়ে রেখেছে দেশটি। তথ্যসূত্র বলছে, বাংলাদেশের জন্য ছয়টি জাহাজে প্রায় পাঁচ লাখ টন এলএনজি এবং ৭৯ হাজার টন অপরিশোধিত তেল আনা হচ্ছে। অর্থাৎ সরবরাহের রুট ও ভলিউমে কোনো উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন নেই। তবুও পাম্পে তেলের অপ্রতুলতা দেখা যাচ্ছে।
এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও প্রশ্ন করছেন, এটি কি আসলেই সংকট নাকি ‘ম্যানেজড’ ক্রাইসিস।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে, পাম্প মালিকরা একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে এই অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন, অতিরিক্ত দাম আদায় এবং কিছু ক্ষেত্রে বিক্রি বন্ধ রাখার মতো আচরণ এই চক্র পরিকল্পিতভাবেই করছে। অর্থাৎ সরবরাহের প্রকৃত অভাব নয়, বরং মুনাফার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল থেকেই তারা এ প্রতারণা করছে।
এ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতিকে ম্যানেজ করার প্রচেষ্টা চলছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, তিন মাসের জন্য দেশব্যাপী ‘বাফার স্টক’ তৈরি করা হচ্ছে। চলতি মাসজুড়ে ১৭টি জাহাজে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন এবং ফার্নেস তেল আনা হয়েছে এবং আরও কয়েকটি জাহাজ এপ্রিলে আসার পথে আছে। পেট্রোবাংলা আগামী ১০ দিনে ১ লাখ ৯২ হাজার টন এলএনজি আমদানি করতে যাচ্ছে।
অর্থাৎ মন্ত্রীর বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, সরবরাহ যথেষ্ট হলেও জনগণকে প্যানিক করার জন্যই জ্বালানি সংকটের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, প্যানিক বায়িং এবং মজুতদারি সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদী চুক্তি ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা।
সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, পাম্প পর্যায়ে যেসব অসংগত আচরণ দেখা দিচ্ছে—মজুতদারি, কালোবাজারি, দাম বাড়ানো—সেগুলো স্থানীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে আনলেই সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। অর্থাৎ দেশের প্রকৃত অর্থে জ্বালানি সংকট নেই, এই অস্থিরতা একটি অসাধু চক্র সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের এই নাটককে আমরা দুটি স্তরে ভাগ করতে পারি। প্রথমত, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার কারণে কিছু ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সরবরাহের প্রক্রিয়া চলমান এবং পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তবুও জ্বালানি সংকটের গুজব ছড়িয়ে বাজারকে অস্থির করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পাম্প মালিকপক্ষের সিন্ডিকেট, প্যানিক বায়িং, মজুতদারি ও কালোবাজারির মাধ্যমে সংকটকে আরও ঘনীভূত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের পরিকল্পিত বাফার স্টক, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম মূল কৌশল হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই “ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট” পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হলে স্বল্পমেয়াদে রেশনিং কার্যকরী হতে পারে।
এককথায় বলা যায়, পাম্পে তেল না থাকা মানে সরবরাহ সংকট নয়—এটি বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অসাধু চক্রের দ্বারা সৃষ্ট অস্থিরতার ফল। প্যানিক না হয়ে জনগণ সচেতন থাকলে এবং সরকার কার্যকর নজরদারি চালালে এই সংকট দ্রুত কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!