ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যেই গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান জরুরি অবতরণ করে। এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, একটি ‘কমব্যাট মিশন’ (যুদ্ধ অভিযান) শেষে ফেরার পথে বিমানটি ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও একই দাবি করা হয়েছে।
যদি ঘটনাটি সত্য হয়, তবে চলমান যুদ্ধে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের বিমান শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইরানের হামলার শিকার হলো। ঘটনাটি সম্পর্কে আমরা যা জানি এবং এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা নিচে তুলে ধরা হলো: গত বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) এফ-৩৫ স্টেলথ (রাডারে ধরা পড়ে না এমন) যুদ্ধবিমানটি জরুরি অবতরণ করার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিংস জানান, বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলট স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন। কেন বা কোথায় বিমানটি অবতরণ করেছে তা স্পষ্ট না করে হকিংস বলেন, “ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে।” একই দিনে ইরানের ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, তারা একটি মার্কিন বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সাময়িকী ‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, পাইলট শ্রাপনেল বা বোমার টুকরার আঘাতে আহত হয়েছেন। ঘটনা সম্পর্কে জানে এমন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানটি গ্রাউন্ড ফায়ার বা মাটি থেকে ছোড়া গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ একটি সামরিক ফুটেজ প্রকাশ করে দাবি করেছে, এতে তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মার্কিন এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমানকে আঘাত করতে দেখা গেছে।
এফ-৩৫ কী এবং এর বিশেষত্ব কী?
এফ-৩৫ হলো মার্কিন অ্যারোস্পেস কোম্পানি লকহিড মার্টিন নির্মিত এক ধরণের স্টেলথ অ্যাটাক ফাইটার বা যুদ্ধবিমান। এর পুরো নাম ‘এফ-৩৫ লাইটনিং-২’। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এটিকে “বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
আকাশপথে আধিপত্য বিস্তারে এই বিমানের খ্যাতির মূল কারণ হলো এর স্টেলথ প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর এবং উচ্চ-গতির কম্পিউটিং ক্ষমতার সংমিশ্রণ। এই বিমানটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন এটি সহজে শনাক্ত করা না যায় এবং আগের প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলোর চেয়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থার অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এতে থাকা ৩৬০-ডিগ্রি ক্যামেরা স্যুট এবং অন্যান্য সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য সরাসরি পাইলটের কাছে পৌঁছে যায়।
ব্রিটিশ নিরাপত্তা ও ঝুঁকি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং সাবেক সামরিক প্রধান প্রশিক্ষক জন ফিলিপস আল জাজিরাকে বলেন, “এফ-৩৫ এর মূল চাবিকাঠি হলো এর রাডার স্যুট।” রাডার স্যুট হলো হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের একটি সংমিশ্রণ যা নির্দিষ্ট হুমকি শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে এবং তার জবাব দিতে সক্ষম।
ফিলিপস ব্যাখ্যা করেন, “এর কোনো সাধারণ বা স্ট্যান্ডার্ড রাডার স্যুট নেই, দেশভেদে এটি ভিন্ন হয়।” তিনি আরও বলেন, “গুঞ্জন রয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু দেশকে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কেবল নির্দিষ্ট ধরণের রাডার দিয়েছে। আমার ধারণা, চীন বা রাশিয়ার মতো বিদেশি প্রতিপক্ষরা যাতে প্রযুক্তিটি রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং (কপি) করতে না পারে, সেজন্যই এই ব্যবস্থা।”
এফ-৩৫ তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে এবং যুক্তরাজ্য। এই দেশগুলো যুদ্ধবিমানের নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি করে অথবা তাদের নিজস্ব সরকারের ব্যবহারের জন্য বিমান সংযোজনের সুবিধা পায়।
এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া এবং ইসরায়েলসহ মোট ২০টি দেশ এই বিমান কিনেছে। এফ-৩৫ লাইটনিং-২ এর তিনটি ধরন রয়েছে। স্টেলথ নকশা অক্ষুণ্ণ রাখতে সবগুলোরই অস্ত্র ভেতরে বসানো থাকে।
- এফ-৩৫এ (F-35A): এটি সবচেয়ে সাধারণ মডেল এবং বেশিরভাগ দেশের কাছেই এটি রয়েছে। বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান যেসব রানওয়ে ব্যবহার করে, এটিও সেখান থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে।
- এফ-৩৫বি (F-35B): ইতালি, জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র এটি ব্যবহার করে। এটি হেলিকপ্টারের মতো উল্লম্বভাবে (vertically) নামতে পারে এবং খুব ছোট রানওয়ে থেকে উড়তে পারে। ফলে ছোট বিমানঘাঁটি, পার্বত্য এলাকা, সমুদ্র সৈকত বা ছোট দ্বীপ থেকে অপারেশন চালানোর জন্য এটি বেশ কার্যকর।
- এফ-৩৫সি (F-35C): এটি একটি সুপারসনিক বিমান, অর্থাৎ এটি শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে চলতে পারে। মার্কিন নৌবাহিনী দূরপাল্লার স্টেলথ অপারেশনের জন্য এই মডেলটি ব্যবহার করে। এখন পর্যন্ত কেবল মার্কিন নৌবাহিনীর কাছেই এই মডেলটি আছে। লকহিড মার্টিন জানিয়েছে, মার্কিন মেরিন কোর তাদের নিজস্ব এফ-৩৫বি এর পাশাপাশি এফ-৩৫সি বিমানও সংগ্রহ করছে। এফ-৩৫বি এর মতো নয়, এফ-৩৫সি-এর জন্য দীর্ঘ রানওয়ের প্রয়োজন হয়। গত সপ্তাহে ইরান ঠিক কোন মডেলের বিমানটি ভূপাতিত করার দাবি করেছে, তা জানা যায়নি।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!