ইসলামে জাকাত কেবল একটি আর্থিক ইবাদত নয়; এটি সমাজে ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। জাকাত ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো ধনী ও দরিদ্র উভয় শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা সম্পদ ও তার মালিককে পবিত্র করার জন্যই জাকাত ফরজ করেছেন। রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী, জাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদের বরকত বৃদ্ধি পায় এবং ধনীদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ অটুট থাকে। যে ব্যক্তি জাকাত আদায় করে, সে তার সম্পদ হারানোর ভয় থেকেও মুক্ত থাকে।
জাকাত আদায় ও বণ্টনের মূলনীতি
রাসুল (সা.)-এর জাকাত বণ্টনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ছিল অঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকার। সাধারণত যে এলাকা থেকে জাকাত সংগ্রহ করা হতো, সেই এলাকার হকদারদের মধ্যেই তা আগে বণ্টন করা হতো। বণ্টনের পর যদি অতিরিক্ত কিছু অবশিষ্ট থাকত, তখনই তা কেন্দ্রীয় বায়তুল মালে জমা রাখা হতো। এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার জন্য তিনি বিভিন্ন অঞ্চল ও গ্রামে জাকাত সংগ্রহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী নিয়োগ করতেন।
হজরত মুআজ (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন—সেখানে ধনীদের কাছ থেকে জাকাত সংগ্রহ করে স্থানীয় দরিদ্রদের মধ্যেই তা বিতরণ করতে। এতে সমাজের ভেতরেই সম্পদের ভারসাম্য বজায় থাকত।
রাসুল (সা.) মানুষের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করেই জাকাত প্রদান করতেন। কেউ যদি সত্যিই জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত হতো, তবে তাকে তা দেওয়া হতো। তবে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি জাকাত চাইলে তিনি সতর্ক করে বলতেন—ধনী ব্যক্তি বা উপার্জনক্ষম শক্তিশালী যুবকের জন্য জাকাতের কোনো অংশ নেই।
সম্পদ নির্ধারণ ও সংগ্রহ পদ্ধতি
রাসুল (সা.) কেবল প্রকাশ্য সম্পদের ওপর জাকাত সংগ্রহের জন্য কর্মচারী পাঠাতেন। যেমন—চতুষ্পদ জন্তু, শস্যদানা ও ফলমূল। খেজুর ও আঙুরের বাগান পরিদর্শনের জন্য তিনি দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ করতেন। তারা ফল পাকার আগেই গাছে থাকা অবস্থায় অনুমান (খারাস) করে জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতেন।
এই পদ্ধতির ফলে বাগানের মালিক ফসলের একটি অংশ আগে থেকেই ব্যবহার করার সুযোগ পেতেন এবং ফসল কাটার সময় জাকাত আদায়কারীদের জন্য অপেক্ষা করতে হতো না। তবে দয়া ও মানবিকতার দৃষ্টিতে রাসুল (সা.) নির্দেশ দিতেন, অনুমানের সময় বাগানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাদ রাখা হবে—যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মালিকের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় থাকে।
কোন সম্পদের ওপর জাকাত ছিল না
রাসুল (সা.) সব ধরনের সম্পদের ওপর জাকাত ধার্য করেননি। যেমন—ঘোড়া, ক্রীতদাস, খচ্চর, গাধা কিংবা শাকসবজি ও তরমুজের মতো এমন জিনিস যা সাধারণত ওজন করে মজুত করে রাখা যায় না—এসবের ওপর তিনি জাকাত নির্ধারণ করেননি।
জাকাত গ্রহণে সংযম ও দোয়া
জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) দাতার সর্বোত্তম সম্পদ গ্রহণ করতেন না। বরং মধ্যম মানের সম্পদ গ্রহণ করাই ছিল তাঁর নীতি। কেউ জাকাতের মাল নিয়ে এলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হতেন এবং দাতার জন্য দোয়া করতেন
‘হে আল্লাহ, আপনি তার ওপর এবং তার সম্পদের ওপর বরকত ও রহমত বর্ষণ করুন।’
(সুনানে নাসায়ি, সহিহ বুখারি)
বিশেষ প্রয়োজনে অগ্রিম জাকাত
বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে রাসুল (সা.) ধনীদের কাছ থেকে অগ্রিম জাকাতও গ্রহণ করতেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি তাঁর চাচা হজরত আব্বাস (রা.)-এর কাছ থেকে দুই বছরের জাকাত অগ্রিম গ্রহণ করেছিলেন এবং তা মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে ব্যয় করেছিলেন। আবার কখনো রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে জাকাতের সম্পদ থেকে সাময়িক ঋণ নেওয়ার ঘটনাও পাওয়া যায়।
দারিদ্র্যবিমোচনের অনন্য দৃষ্টান্ত
রাসুল (সা.)-এর জাকাত ও সদকা ব্যবস্থা ছিল দারিদ্র্যবিমোচনের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি কেবল সম্পদ সংগ্রহই করেননি; বরং এমনভাবে বণ্টন করেছেন যাতে দরিদ্র মানুষেরা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়।
বর্তমান যুগেও যদি রাসুল (সা.)-এর এই সুন্নাহ অনুযায়ী জাকাত ও ফিতরার সুষ্ঠু ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমবে এবং দারিদ্র্য অনেকাংশেই দূর হতে পারে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!