লাইলাতুল কদর, শবে কদর,
রমজান মাসের ২৭তম রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলা হয়েছে।   ছবি: আরটিএনএন
লাইলাতুল ক্বদর ইসলামে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রজনী যার মহিমা অপরিসীম। সারা বিশ্বের মুসলমানরা অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে দিনটি পালন করে। ‘লাইলাতুল ক্বদর’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো ভাগ্যের রাত। ‘লাইলাতুন’ অর্থ রাত এবং ‘ক্বদর’ অর্থ ভাগ্য বা মহিমা, তাই লাইলাতুল ক্বদর অর্থ ভাগ্যের রাত বা মহিমান্বিত রাত। এই রাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ  এই রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। (সুরা দুখান: ৪)।

এই রাতের গুরুত্ব

এই রাতে প্রথম কোরআন নাযিল হয়। এবং আল্লাহ তা’আলা এই রাতকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলেছেন। إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ  নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) এক বরকতময় রাতে নাযিল করেছি; নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। (সুরা দুখান: ৩)। 

আল্লাহ তা’আলা পূর্ণ একটি সূরা নাযিল করেছেন এই রাতের উপরে, সুরা ক্বদর: إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ ۝١ وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ ۝٢ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ ۝٣ تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ ۝٤ سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ ۝٥  নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাযিল করেছি শবে কদরে। আর তুমি কি জানো শবে কদর কী? শবে কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ এবং রূহ (জিবরাইল) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে সব বিষয় নিয়ে অবতীর্ণ হন। সে রাত শান্তিময়, ফজরের উদয় হওয়া পর্যন্ত।

শবে ক্বদরের ফজিলত সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদত (নামাজ) করবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারী: ২০১৪, সহিহ মুসলিম: ৭৬০)। 

শবে কদর কবে থেকে খুঁজবো?

রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতটি নির্দিষ্টভাবে পাওয়ার জন্য রমজানের শেষ দশকে বিশেষভাবে সচেষ্ট হতে বলেছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়: تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ  বাংলা অনুবাদ: তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর অনুসন্ধান করো। (সহিহ বুখারী: ২০১৭)। 
কিছু বর্ণনায় ২৭তম রাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলা হয়েছে। তবে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী এই রাত প্রতি বছর একই তারিখে নাও হতে পারে। এটি ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ তারিখেও হতে পারে। রাসুল (সা.) বলেছেন, "আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল। কিন্তু পরে তা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে তা অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি: ২০২৩, সহিহ মুসলিম: ১১৬৭)। শরিয়ত অনুযায়ী, ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ রমজানের রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করা সুন্নাত। তবে রমজানের শেষ ১০টি রাতের প্রতিটিতেই ইবাদত করা সবচেয়ে নিরাপদ উপায় যেন কোনোভাবেই এই বরকতময় রাতটি ছুটে না যায়।

শবে ক্বদরের আমল

উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এই রাতে পড়ার জন্য দোয়া জানতে চাইলে তিনি এটি শিক্ষা দেন। اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي  (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়ুন, তুহিব্বুল আফওয়া ফাউফু আন্নী) হে আল্লাহ! আপনি নিশ্চয়ই অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। (জামে আত-তিরমিযী: ৩৫১৩)।
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস, مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ  নবী করীম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম (ইবাদত বা নামাজ) করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি: ১৯০১)। আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন রমজানের শেষ দশ দিন আসত, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) রাত্রি জাগরণ করতেন (ইবাদতের জন্য), তাঁর পরিবারকেও জাগিয়ে তুলতেন এবং খুব কঠোরভাবে (ইবাদতের জন্য) কোমর বেঁধে নিতেন।" (সহিহ মুসলিম: ১১৭৪)। 
শবে ক্বদরের নির্দিষ্ট কোন আমল নেই। এই রাতে যত নফল ইবাদাত রয়েছে তা করা ও বিশেষ করে নামাজের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।

শবে কদরের আলামত বা লক্ষণ

রমজানের শেষ দশকের কোন রাত শবে ক্বদর তা নির্দিষ্ট নয় ফলে কিছু আলামত বা লক্ষণের মাধ্যমে রাতটি চিহ্নিত করা যায়। এই রাতের প্রশান্তি এবং পরবর্তী সকালের সূর্যের অবস্থা সম্পর্কে : উবাই ইবনে কাব (রা.) এবং জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস: إنَّ أمَارَةَ لَيْلَةِ القَدْرِ أنَّهَا صَافِيَةٌ بَلِجَةٌ كَأَنَّ فِيهَا قَمَراً سَاطِعاً...  লাইলাতুল কদরের আলামত হলো- রাতটি স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল হবে, যেন তাতে একটি উজ্জ্বল চাঁদ রয়েছে। রাতটি খুব গরম বা খুব ঠান্ডাও হবে না নাতিশীতোষ্ণ হবে। আর কদরের পরের দিন সকালে সূর্য উঠবে তেজহীন অবস্থায়, যা দেখতে থালা সদৃশ হবে। (সহিহ মুসলিম: ৭৬২)। 

শবে ক্বদর বছরে একবার আসে যা হাজার রাতের চেয়ে উত্তম। যার ফজিলত অপরিসীম। নবী করীম (সা.) তার জীবদ্দশায় কখনও রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ ছাড়া কাটাননি, এমনকি ইতিকাফে শুধুমাত্র ইবাদত করেছেন যেন শবে ক্বদর ছুটে না যায়। যদি এ বছর শবে ক্বদর ছুটে যায় তাহলে তা আবার আগামী বছরে আসবে। ততো দিন সে ব্যাক্তি বেঁচে থাকবে কি না তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। সুতরাং সকলের উচিত যেন শবে ক্বদর কোন মূল্যেই না ছুটে যায়।