যাকাত, ফেতরা, সাদাকাতুল ফিতর
ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদতের মধ্যে যাকাত ও ফেতরা (সাদাকাতুল ফিতর) অন্যতম।   ছবি: আরটিএনএন

সলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এতে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের জন্য সুস্পষ্ট বিধান দেওয়া হয়েছে। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদতের মধ্যে যাকাত ও ফেতরা (সাদাকাতুল ফিতর) অন্যতম। যাকাত ধনীদের সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজের দরিদ্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। আর ফেতরা রমজানের রোজার পরিশুদ্ধি এবং দরিদ্র মানুষের ঈদের আনন্দ নিশ্চিত করার জন্য বিধান করা হয়েছে।

যাকাতের পরিচয়:
যাকাত আরবি শব্দ। এর অর্থ পবিত্রতা, বৃদ্ধি ও বরকত। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত অংশ অস্বচ্ছল, গরিব-মিসকিনদের মাঝে প্রদান করাকে যাকাত বলা হয়।

যাকাতের বিধান:
যাকাত ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত এবং ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ “তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।” (সূরা আল-বাকারা: ৪৩)।

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا “তুমি তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ কর, যার মাধ্যমে তুমি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।” (সূরা আত-তাওবা: ১০৩)।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন- بُنِيَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ  “ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত- আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসূল—এই সাক্ষ্য দেওয়া, সালাত কায়েম করা এবং যাকাত প্রদান করা…” (সহিহ বুখারি: ৮; সহিহ মুসলিম: ১৬)।

যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত:
যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে:
১. মুসলমান হওয়া
২. স্বাধীন হওয়া
৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া
৪. সেই সম্পদের ওপর এক বছর অতিক্রম হওয়া
৫. ঋণমুক্ত থাকা (মূল প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ)

যাকাতের নিসাব:
নিসাব হলো সেই নির্ধারিত সম্পদের পরিমাণ, যার মালিক হলে যাকাত ফরজ হয়।
নিসাবের পরিমাণ:
• স্বর্ণ: ৮৭.৪৮ গ্রাম/৭.৫ ভরি।
• রৌপ্য: ৬১২.৩৬ গ্রাম/ ৫২.৫ ভরি।

যাকাতের হার:
যাকাতের পরিমাণ হলো মোট সম্পদের ২.৫ শতাংশ।
উদাহরণ: যদি কারো মোট সম্পদ ৫,০০,০০০ টাকা হয়, তাহলে যাকাত হবে:
৫,০০,০০০ × ২.৫%  = ১২,৫০০ টাকা

যাকাতের খাত:
কোরআনে যাকাতের আটটি খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُم “যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত সংগ্রহকারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য।” (সূরা আত-তাওবা: ৬০)।

ফেতরার পরিচয়:
রমজান মাস শেষে ঈদুল ফিতরের আগে দরিদ্র মানুষের মাঝে যে দান প্রদান করা হয় তাকে ফেতরা বা সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়।

ফেতরার বিধান: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ফেতরা ওয়াজিব।

ফেতরার উদ্দেশ্য:
ফেতরার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে:
১. রোজার ভুলত্রুটি দূর করা
২. দরিদ্র মানুষের ঈদের আনন্দ নিশ্চিত করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ  “রাসূলুল্লাহ ﷺ সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন, যাতে রোজাদার অনর্থক ও অশ্লীল কথা থেকে পবিত্র হয়।” (সুনানে আবু দাউদ: ১৬০৯; ইবনে মাজাহ: ১৮২৭)।

ফেতরা আদায়ের সময়:
ফেতরা আদায়ের উত্তম সময় হলো ঈদের নামাজের আগে أَمَرَ بِهَا أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ
“রাসূল ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন- মানুষ ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে যেন ফেতরা আদায় করা হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫০৩)।

ফেতরার পরিমাণ (২০২৬ বাংলাদেশ):
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে ফেতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারণ করেছে ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৮০৫ টাকা। ফেতরা (যা রমজান শেষে ঈদুল ফিতরের আগে দিতে হয়) মূলত খাদ্যভিত্তিক হয়। ফেতরা সাধারণত মানুষের প্রয়োজনীয় খাবারের মানদণ্ড অনুযায়ী ধরা হয়, যাতে গরীবরা ঈদে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে। 
ফেতরা দেওয়ার জন্য প্রায়শই ব্যবহৃত খাবারের তালিকা:
গম/গমের আটা – সবচেয়ে প্রচলিত ধরণের ফেতরা।
যব– গরীবদের খাদ্য হিসাবে গ্রহণযোগ্য।
চাল– অনেক দেশে চাল ভিত্তিক ফেতরা দেওয়া হয়।
খেজুর – বিশেষত আরব অঞ্চলে প্রচলিত।
ময়দা বা অন্যান্য ধানজাত খাদ্য – স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য যেকোনো সংরক্ষণ করে রাখা যায় এমন দৈনন্দিন খাবার। প্রতিটি পরিবারের সদস্যের জন্য আলাদা ফেতরা দিতে হয়। এছাড়া খেজুর, কিসমিস ও পনিরের মূল্যেও ফেতরা দেয়া যায়।

উদাহরণ:
৫ জনের পরিবার হলে
১১০ × ৫ = ৫৫০ টাকা (ন্যূনতম)

যাকাত ও ফেতরা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। এগুলোর মাধ্যমে সমাজে দরিদ্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয় এবং ধনী-গরিবের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত যথাযথ নিয়মে যাকাত ও ফেতরা আদায় করা।