সুনীল গাভাস্কার পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, 'শূন্যের' গেরো কাটাতে তার উচিত একটি সিঙ্গেল নেওয়া। সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক এবং নিজেও একজন ওপেনার হিসেবে তিনি ধুঁকতে থাকা অভিষেক শর্মাকে বলেছিলেন, "তার উচিত জোর করে আড়াআড়ি ব্যাটে বড় শট খেলার চেষ্টা না করা। একটি সিঙ্গেল নিয়ে রানের খাতা খোলা উচিত। এমনকি চারটি ডট বল হলেও কিছু যায় আসে না।" ওপেনার অভিষেক বল বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে বিশ্বকাপে তার টানা ডাক বা শূন্য রানের ধারা ভাঙেন এবং ফর্মে ফেরার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আশা জাগান। তবে শেষ পর্যন্ত তা খুব একটা কাজে আসেনি, কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনি এবং তার দল উভয়ই ডুবেছে।
অভিষেক আরও দুটি বাউন্ডারি মারতে সক্ষম হলেও বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে যে বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা কাটাতে পারেননি। এর আগে তিনি অফ-স্পিনারদের বিপক্ষে সমস্যায় পড়েছিলেন, যার ফলে গত দুটি ম্যাচে আউট হন। তবে রবিবার রাতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পেসাররা তাকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছিল। বড় শট খেলা আটকাতে তারা ওয়াইড এবং স্লোয়ার বল করেছিল। এটা স্পষ্ট যে তরুণ এই ওপেনারকে তার খেলায় বিবর্তন আনতে হবে, কারণ প্রতিপক্ষরা তার দুর্বলতা ধরে ফেলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
অভিষেকের পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত, তা নিয়ে ভারতীয় কোচদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সহকারী কোচ রায়ান টেন ডেসকাট বলেন, "আমার মনে হয় বিশ্বকাপে আসার আগে অভিষেকের প্রস্তুতি এবং একপর্যায়ে তার ফুড পয়জনিং হওয়ার ঘটনাটি এই পর্যায়ে আমরা তাকে যেখানে দেখতে চেয়েছিলাম, সেখানে পৌঁছানোর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।"
"আপনি চান সে যেন ফর্মে থাকে, নিজের সুইং ও গেম প্ল্যান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকে। কিন্তু যখন আপনি টানা তিনবার শূন্য রানে আউট হন, তখন তা আপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। আমি শুক্রবার নেটে তার মধ্যে কিছু খুব ভালো লক্ষণ দেখেছি, যা আমি তখন প্রেস কনফারেন্সেও বলেছিলাম। কিন্তু তাকে কিছুটা অপ্রস্তুত মনে হচ্ছে এবং কোচিং স্টাফ হিসেবে আমাদের কাজ হলো সেটা ঠিক করা। আমাদের হাতে এর জন্য চার দিন সময় আছে।"
কিন্তু ব্যাটিং কোচ সিতাংশু কোটাক মনে করেন, এখন তার টেকনিক বা অ্যাপ্রোচ নিয়ে কাজ করার সময় নয়। তিনি বলেন, "আমার মনে হয় না এটা কোনো স্ট্রাগল বা বড় সমস্যা। আজও আমার মনে হয়েছে সে একটা শুরু পেয়েছিল। এই সময়ে ব্যাটারকে অনেক কথা বলার চেয়ে কিছু না বলাই বেশি উপকারী। প্রত্যেক খেলোয়াড়েরই এমন ২-৩ ম্যাচের খারাপ সময় আসে। আর ঠিক এই সময়েই পাঁচজন মানুষ ভাবে, 'চলো গিয়ে তাকে কিছু বলি'।"
"যদি আমার জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করেন, তবে আমি মনে করি না আপনি দুই দিনে তাকে কিছু বলে পরিবর্তন করতে পারবেন। বরং এতে তার মনে আরও সন্দেহ তৈরি হবে। আমি এভাবেই ভাবি। এটাই আমার কোচিং দর্শন। যদি ১৫ দিন সময় থাকে, তবে আপনি কিছু করতে পারেন। অন্যথায়, এখন শুধু বলের ওপর ভালো নজর রাখাটাই আসল।"
"তাকে তার ইনিংস আরও ভালোভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যা আমরা আলোচনা করি—তার স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী এক বা দুজন মানুষের সঙ্গে কথা বলে। এটা শুধু অভিষেকের জন্য নয়, যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই। সে এমন একজন খেলোয়াড় যে আইপিএলেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। আমি জানি। কিন্তু ২-৩ ম্যাচের এই হাই-রিস্ক, হাই-রিওয়ার্ড (উচ্চ ঝুঁকি, উচ্চ পুরস্কার) পরিস্থিতিতে এমনটা ঘটবেই। তাই আমাদের এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।"
বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত অভিষেক বিশ্বকাপে অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। টুর্নামেন্টের শুরুতে টানা তিন ডাকের পর রবিবার রাতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তার ১৫ রানের ইনিংসটিও ছিল নড়বড়ে। তার ফর্মহীনতার সঙ্গে ভারতের এখন পর্যন্ত দুর্বল পারফরম্যান্সও মিলে গেছে।
যশস্বী জয়সওয়াল, বৈভব সূর্যবংশী এবং ধ্রুব জুরেলের মতো খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রখ্যাত কোচ জুবিন বারুচা বলেন, "এই ফরম্যাটের মধ্যেই উচ্চ পরিবর্তনশীলতা এবং অনিশ্চয়তা গেঁথে আছে। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচ, ম্যানেজমেন্ট, মালিক এবং খেলার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেরই এটা সবার আগে বোঝা জরুরি। অভিষেক শর্মার সমস্যাটি ঠিক এই আগুনের কড়াইয়ের মধ্যেই বিদ্যমান।"
"এটি 'ফর্ম' সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এমন একটি ফরম্যাটে যেখানে একজন খেলোয়াড় যেকোনো দিন শূন্য থেকে শতক পর্যন্ত সুইং করতে পারে—যেমনটা আমরা সঞ্জু স্যামসনের ক্যারিয়ারে ওপেনিংয়ের সময় দেখেছি (শূন্য অথবা শতক)—সেখানে ফর্মের ধারণা প্রায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ব্যর্থতা এবং সাফল্য লুফে নেওয়ার মধ্যে এই দোদুল্যমানতার সঙ্গে খেলোয়াড়দের মানিয়ে নিতে হবে।"
বারুচা—যিনি স্যামসনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, এবং ভারত যদি টপ অর্ডারে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেয় তবে স্যামসন অভিষেকের জায়গার সম্ভাব্য দাবিদার—বলেন, "অভিষেক শর্মার জন্য নেটে একের পর এক বল পেটানোকে সাফল্য মনে করাটা খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। এর চেয়ে বরং সেই একই ভয়হীন, প্রায় অবিশ্বাস্য মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামার ওপর ফোকাস করা উচিত যা তাকে সাম্প্রতিক সাফল্য এনে দিয়েছে—এবং মুহূর্তটি এলে তা সর্বোচ্চ কাজে লাগানো উচিত।"
বাস্কেটবল কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডানের কথাগুলো হয়তো অভিষেকের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত। "আমি আমার ক্যারিয়ারে ৯,০০০-এর বেশি শট মিস করেছি। আমি প্রায় ৩০০টি ম্যাচ হেরেছি। ২৬ বার আমাকে গেম-উইনিং বা ম্যাচ জেতানোর শট নেওয়ার জন্য বিশ্বাস করা হয়েছে এবং আমি মিস করেছি। আমি আমার জীবনে বারবার ব্যর্থ হয়েছি। আর এ কারণেই আমি সফল।" এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত খেলা চারটি ইনিংসেই অভিষেক ব্যর্থ হয়েছেন। জর্ডানের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, হয়তো এ কারণেই পরবর্তী কয়েকটি ম্যাচে তার সফল হওয়ার আশা রয়েছে।
সূত্র : ক্রিকবাজ
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!