বিড়াল
বিড়াল।   প্রতীকী ছবি

ঢাকার একটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় দুপুরের রোদে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে সাদা লোমওয়ালা একটি পার্সিয়ান বিড়াল। পাশে রাখা ছোট একটি বাটি—ভেতরে বিদেশি ব্র্যান্ডের শুকনো খাবার। ঘরের ভেতরে ফ্রিজের দরজায় চুম্বকে আটকানো একটি ছোট কার্ড; সেখানে লেখা গত মাসে বিড়ালটির টিকা দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছর আগেও এ দৃশ্য ছিল অস্বাভাবিক। কিন্তু এখন শহুরে বাংলাদেশের বহু বাসায় এটি খুবই পরিচিত চিত্র।

একসময় যে প্রাণীটিকে কেবল ঘরের কোণে ঘুমিয়ে থাকা এক নিঃশব্দ সহচর হিসেবে দেখা হতো, আজ তার চারপাশে গড়ে উঠেছে এক নতুন অর্থনৈতিক পরিসর। খাদ্য আমদানি, পোষা প্রাণীর দোকান, চিকিৎসা সেবা, অনলাইন ব্যবসা, ব্রিডিং, টিকা ও আনুষঙ্গিক পণ্যের বিস্তৃত বাজার—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব কিন্তু ক্রমবর্ধমান খাত। অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক হিসাবপত্রে এর আলাদা কোনো পরিচয় না থাকলেও বাস্তবে এটি শহুরে জীবনের একটি দৃশ্যমান অর্থনৈতিক প্রবাহ—যাকে অনেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলছেন “বিড়াল অর্থনীতি।”

নগর জীবনের পরিবর্তন আর বিড়ালের উত্থান

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে বিড়াল সব সময়ই ছিল। তবে সেটি ছিল প্রায় অবহেলিত এক সহচর—ইঁদুর ধরার প্রাণী, উঠোনের কোণে ঘুমিয়ে থাকা একটি উপস্থিতি। কিন্তু শহুরে জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই অবস্থান বদলে গেছে। ছোট পরিবার, ব্যস্ত জীবন, একাকীত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব—সব মিলিয়ে বিড়াল এখন অনেক পরিবারের কাছে সঙ্গী প্রাণী কিংবা পরিবারের সদস্যের মতো হয়ে উঠেছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার মতো শহরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণী কিংবা কর্মজীবী অবিবাহিত মানুষের মধ্যে বিড়াল পালনের ঝোঁক স্পষ্টভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে অসংখ্য “ক্যাট কমিউনিটি” গড়ে উঠেছে, যেখানে বিড়ালের ছবি, স্বাস্থ্য পরামর্শ, দত্তক দেওয়ার পোস্ট কিংবা খাবারের রিভিউ নিয়মিত দেখা যায়।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার অভিজ্ঞতা অনেক মানুষকে পোষা প্রাণীর দিকে আকৃষ্ট করেছে। সেই সময় থেকেই বিড়াল পালনের প্রবণতা নতুন গতি পায়।

বিদেশি খাবারের বাজার

বিড়াল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশটি খাদ্য বাজার। বাংলাদেশে এরই মধ্যে ক্যাট ফুড তথা বিড়ালের খাবারের ৫০০ কোটি টাকার বাজার গড়ে উঠেছে। এতে দেশীয় খাবারের হিস্যা ১০০ কোটি টাকার মতো, বাকি প্রায় ৪০০ কোটি টাকার খাবার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে মোট বিড়ালের খাবার আমদানির পরিমাণ ছিল ৩২,১৫৬ টন। এর মধ্যে চীন থেকেই সর্বোচ্চ ১৭,৭৩৮ টন খাবার এসেছে। থাইল্যান্ড থেকে ৭,৪১৮ টন এবং তুরস্ক থেকে ৬,৭৪০ টন খাবার আমদানি হয়েছে। এছাড়া ফ্রান্স থেকে ১২০ টন এবং ভারত থেকে এসেছে ১৪০ টন। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে আমদানি হয়েছে মোট ৩ কোটি ২৩ লাখ মার্কিন ডলারের খাবার। দেশীয় মুদ্রায় এই খাতে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯৪ কোটি ১২ লাখ টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে)।

ঢাকার কাটাবন, বসুন্ধরা বা ধানমন্ডির পোষা প্রাণীর দোকানে ঢুকলে দেখা যায় রঙিন প্যাকেটের সারি। আন্তর্জাতিক নানা ব্র্যান্ডের ক্যাট ফুড এখন বাংলাদেশে সহজলভ্য।

মাঝারি মানের ক্যাট ফুড প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। এই শ্রেণিতে রয়েছে মেও, ক্যাটি বস, ক্যাপ্টেন, জঙ্গল, পাওপাও ইত্যাদি। কম দামের ক্যাট ফুডের মধ্যে স্মার্ট হার্টের দাম পড়ে ৩০০ টাকা প্রতি কেজি। বিক্রেতাদের মতে, মেও এবং স্মার্ট হার্ট সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।

প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে Royal Canin এবং BonaCibo, যার দাম সাধারণত ১,০০০–১,৫০০ টাকা প্রতি কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া দেশীয় উদ্যোগেও কিছু ক্যাট ফুড তৈরি শুরু হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে পোষা প্রাণী সম্পর্কিত বাজার প্রায় ২৩০ কোটি টাকার বেশি, যা প্রতি বছর ১০–১৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্য অংশ এই বাজারের ৫৭ শতাংশ, ওষুধ ১৯ শতাংশ, লিটার ১৬ শতাংশ, টিকা শতাংশ এবং অন্যান্য শতাংশ, এবং পেট ফুড ও অ্যাক্সেসরিজের ব্যবসা বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বিড়ালের দাম: শখ থেকে ব্যবসা

বিড়াল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিড়াল বিক্রি ও ব্রিডিং ব্যবসা। বাংলাদেশে সাধারণ দেশি বিড়ালের দাম খুব কম হলেও বিদেশি জাতের বিড়ালের দাম অনেক বেশি। শহরের পেট শপ বা অনলাইন বাজারে বিভিন্ন জাতের বিড়াল বিক্রি হয়।

বর্তমান বাজারে আনুমানিক দামগুলো হলো—দেশি বিড়াল: ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, পার্সিয়ান বিড়াল: ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা, স্কটিশ ফোল্ড: ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা, মেইন কুন: ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ রঙ, লোমের মান বা বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণে দাম আরও বাড়তে পারে।

কিছু উদ্যোক্তা এখন ছোট পরিসরে ব্রিডিং খামার গড়ে তুলেছেন। তারা নির্দিষ্ট জাতের বিড়াল পালন করে বাচ্চা উৎপাদন এবং বিক্রির মাধ্যমে নিয়মিত আয় করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ব্যবসাকে আরও সহজ করে দিয়েছে।

চিকিৎসা সেবার নতুন চাহিদা

বিড়াল পালনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনও। ঢাকা ও চট্টগ্রামে এখন বেশ কিছু বেসরকারি পেট ক্লিনিক ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। এসব কেন্দ্রে টিকা দেওয়া, অপারেশন, রোগ নির্ণয়, এমনকি বিড়ালের গ্রুমিং পর্যন্ত করা হয়। সরকারি পর্যায়েও কিছু ভেটেরিনারি হাসপাতাল পোষা প্রাণীর চিকিৎসা দিয়ে থাকে।

বিড়ালের জন্য নিয়মিত টিকা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলাতঙ্কসহ কয়েক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ প্রতিরোধে বছরে একাধিক টিকা দিতে হয়। বছরে কয়েক হাজার টাকা খরচ হলেও অনেক পরিবার এটিকে তাদের পোষা প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবে মেনে নিয়েছে।

বর্তমানে দেশে আনুমানিক ২০০ থেকে ২২৫টির বেশি বেসরকারি পেট ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, যেখানে বিড়ালের জন্য টিকা প্রদান, সার্জারি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, রোগ নির্ণয় এবং গ্রুমিংসহ বিভিন্ন আধুনিক সেবা দেওয়া হয়। শহরভিত্তিক এই ক্লিনিকগুলো মূলত পোষা প্রাণীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সরকারি পর্যায়েও কিছু সেবা রয়েছে; প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ঢাকার সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালেও পোষা প্রাণীর চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশে বিড়ালসহ পোষা প্রাণীর জন্য একটি পৃথক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে উঠছে।

কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র

বিড়ালকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বাজার বহু মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। পোষা প্রাণীর দোকান মালিক, খাদ্য আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর, অনলাইন বিক্রেতা, ভেটেরিনারি ডাক্তার, গ্রুমার—সব মিলিয়ে একটি বিস্তৃত কর্মসংস্থান চক্র তৈরি হয়েছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা অনলাইনে ক্যাট অ্যাক্সেসরিজ বিক্রি করছেন। কেউ কেউ পোষা প্রাণীর গ্রুমিং সেন্টার চালু করেছেন। আবার কোথাও পরীক্ষামূলকভাবে “ক্যাট হোটেল” বা পোষা প্রাণীর অস্থায়ী আবাসনের সেবাও শুরু হয়েছে। এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলো মিলেই গড়ে উঠছে এক নতুন নগরভিত্তিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্র।

বিড়াল অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়িত। সরাসরি কর্মসংস্থানের মধ্যে রয়েছে পেট শপ মালিক, ভেটেরিনারি ডাক্তার, পোষা প্রাণীর গ্রুমার, ক্যাট ব্রিডার এবং অনলাইন পেট পণ্য বিক্রেতারা। পাশাপাশি পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর, ডেলিভারি কর্মী, পশুখাদ্য উৎপাদক এবং পশু চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবসায়ীরা। উদাহরণস্বরূপ, শুধু একটি বড় ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিই দেশের ৫০০-এর বেশি বিক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহ করে থাকে। ফলে বোঝা যায়, বিড়াল ও পোষা প্রাণীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক খাতে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে।

অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন খাত

বাংলাদেশে পোষা প্রাণী সম্পর্কিত বাজার ইতিমধ্যে কয়েকশ কোটি টাকার আকার নিয়েছে। এর বড় অংশই বিড়ালকে ঘিরে তৈরি। খাদ্য আমদানি, চিকিৎসা সেবা, ব্রিডিং, পেট শপ এবং অনলাইন ব্যবসা—সব মিলিয়ে এই খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষ যুক্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের কাছাকাছি। নগরায়ণ যত বাড়বে, ততই এই বাজারের পরিধি বাড়বে।

যদি স্থানীয়ভাবে পোষা প্রাণীর খাদ্য উৎপাদন শুরু হয় এবং এই খাতের জন্য নীতিমালা তৈরি করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে।

সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়

এই দ্রুত বর্ধনশীল বাজারের সামনে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বাজারের বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর হওয়ায় দাম তুলনামূলক বেশি। অনেক সময় নিম্নমানের বা নকল পণ্যও বাজারে দেখা যায়। ঢাকার বাইরে উন্নত ভেটেরিনারি সেবা এখনো সীমিত। এছাড়া বিড়াল ব্রিডিং ও বিক্রির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় প্রাণী কল্যাণের প্রশ্নও ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতকে টেকসই করতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় পেট ফুড উৎপাদন এবং পশু চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন।

এক নীরব অর্থনৈতিক প্রবাহ

সব মিলিয়ে শহুরে বাংলাদেশের পরিবর্তিত জীবনধারা একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। একসময় যে বিড়ালকে শুধু ঘরের কোণে ঘুমিয়ে থাকা প্রাণী হিসেবে দেখা হতো, আজ তার চারপাশে তৈরি হয়েছে খাদ্য, চিকিৎসা, ব্যবসা ও সেবার বিস্তৃত বাজার। অর্থনীতির বৃহৎ পরিসরে এটি হয়তো এখনো ছোট একটি খাত। কিন্তু নগর সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই “বিড়াল অর্থনীতি” ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে—নীরবে, কিন্তু স্থিরভাবে।
বাংলাদেশের শহুরে জীবনের পরিবর্তনের গল্পে তাই নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছে—একটি ছোট প্রাণীকে ঘিরে গড়ে ওঠা বড় এক বাজারের গল্প।