চট্টগ্রাম, জঙ্গল সলিমপুর
জঙ্গল সলিমপুর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের অনুসারীদের দখলে।   ছবি: সংগৃহীত

ট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন র‍্যাব সদস্যরা। সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন র‍্যাব কর্মকর্তা মো. মোতালেব। হামলাকারীরা প্রথমে তার সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পায়ে গুলি করে। পরে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে লাঠি, রড ও কাঠ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আর মারধরের ঘটনাটি ঘটে সলিমপুরের ছিন্নমূলে বিএনপির একটি নির্বাচনী কার্যালয়ের ভেতরে। 

জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের অনুসারীরাই এ হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনও ঘটনাস্থলে ছিলো। একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ইয়াসিন বর্তমানে বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় সক্রিয়। উত্তর চট্টগ্রামের বাসিন্দা এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার আশ্রয়ে সে এখন চালাচ্ছে তার সন্ত্রাসের সাম্রাজ্য। 

পুলিশ, র‍্যাব ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেলে ইয়াসিনের নেতৃত্বে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি বিএনপি কার্যালয় উদ্বোধনের কথা ছিল। এ উপলক্ষে সেখানে বিপুলসংখ্যক লোকজন জড়ো হয়। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রোকন গ্রুপের (বহিষ্কৃত যুবদল নেতা) অনুসারী ও র‍্যাবের সোর্স মনা র‍্যাবকে জানান যে, ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইয়াসিন উপস্থিত থাকবেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম র‍্যাবের পতেঙ্গা কোম্পানি থেকে একটি টিম সেখানে অভিযান পরিচালনার জন্য যায়। বিকেল পৌনে চারটার দিকে অভিযানে যাওয়া র‍্যাব সদস্যদের ওপর ইয়াসিন গ্রুপের অনুসারীরা হামলা চালায়। একপর্যায়ে র‍্যাবের চার সদস্য ও সোর্স মনাকে আটকে ফেলা হয়। এ সময় র‍্যাবের অন্য সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। আটকে রাখা সদস্যদের বিএনপির কার্যালয়ে নিয়ে তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয়।

জঙ্গল সলিমপুরের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে জানান, সোমবার সেখানে ধানের শীষের নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন করার কথা ছিল।বিকাল ৩টা থেকে সেখানে রাজনৈতিক সভা শুরু হয়। তবে চারটার দিকে র‍্যাবের সদস্যরা ওই সভায় প্রবেশ করে আসামি খুঁজতে থাকে। এ সময় ইয়াসিনের লোকজন হামলা করে। তারা র‍্যাবের মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে এবং তাদের ৩ জনকে অপহরণ করে ছিন্নমূলের বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে নির্যাতন চালায়।

পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, র‍্যাবের দুটি মাইক্রোবাস (হাইয়েস) সলিমপুরে যাওয়ার পর লাঠিসোঁটা নিয়ে কিছু ব্যক্তি সেটিকে ধাওয়া দিচ্ছেন। একপর্যায়ে মাইক্রোবাস দুটির কাচ ভাঙচুর করেন তাঁরা। হামলার সময় ওই এলাকায় মাইকে ঘোষণা দেওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ঘোষণায় এলাকার ফটক আটকানোর জন্য বলছিলেন এক ব্যক্তি।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে বসে আছেন আহত কয়েকজন র‍্যাব সদস্য। তাঁদের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ। কক্ষের মেঝে রক্তে লাল হয়ে আছে। পুলিশ সদস্যরা আহত র‍্যাব সদস্যদের গাড়িতে তুলে দিয়ে আসছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকাল তিনটায় ওই এলাকায় বিশেষ গ্রেপ্তার অভিযানে গেলে ইয়াসিনের বাহিনীর সদস্য কালা ইয়াছিন, নুরুল হক ভান্ডারী, ওমর ফারুক, মো. কাজী ফারুকসহ ৪০০-৫০০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল র‍্যাবের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় তারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে র‍্যাবের সদস্যের মারধর করে ও একটি মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে হঠাৎ মাইকে ‌‘বাইরের মানুষ ঢুকে পড়ছে, সবাই বের হন, বাড়ি–ঘর বাঁচান’ এ জাতীয় কথা বলতে থাকে। সেই ঘোষণার পর মুহূর্তেই বিভিন্ন গলি থেকে লোকজন ছুটে যায় পাহাড়ের দিকে। অনেকে আবার বলেন, মাইকের শব্দটি ঠিক মসজিদের মাইকের আওয়াজের মতো লাগেনি, বরং কোনো মোবাইল স্পিকারের মতো শোনায়। এমনকি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একই ধরনের শব্দ দুই জায়গা থেকে ভেসে আসে বলেও কেউ কেউ দাবি করেছেন।

স্থানীয় মসজিদ কমিটির একজন সদস্য বলেন, তাদের মাইক কেউ অপব্যবহার করেনি। তিনি দাবি করেন, ওই সময় মসজিদে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এলাকায় কিছু অসাধু লোক আলাদা মাইক ব্যবহার করে বাড়িঘর রক্ষার নামে মানুষকে উত্তেজিত করতে পারে। 

আমরা নিজেরাই ঘটনাটিতে বিব্রত, বলেন কমিটির এই সদস্য।

র‍্যাব-৭, চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানান, সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ৪৩ জন র‍্যাব সদস্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযানে গিয়েছিলেন। এলাকাটিতে র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ দুষ্কৃতকারী র‍্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় নায়েক সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াসহ র‍্যাবের চারজন সদস্য গুরুতর আহত হন। তাঁদের পুলিশের সহযোগিতায় উদ্ধার করে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোতালেব হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।

র‍্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, তারা পরিকল্পনা করে এই হামলা চালিয়েছে। আমাদের টিম মেম্বারদেরকে বিএনপির অফিসে নিয়ে মারধর করেছে। রাতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অভিযানের আগে হামলাকারীরা গভীর জঙ্গলের মাধ্য দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। তাদের ধরতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।  

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে আগাম খবর পেয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। তখন এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রশাসনের ভাষ্যমতে, প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা এখানে নতুন নয়। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন। এর আগে ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র‍্যাবের সঙ্গে এবং একই বছরের ২ আগস্ট ও ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি সম্প্রতি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েও সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। পাহাড়ের প্রবেশমুখে থাকা পাহারাদারদের সংকেত পেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আগেভাগেই পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেয় এবং অতর্কিত হামলা চালায়, যা এবারের র‍্যাবের অভিযানেও দেখা গেছে। 

সূত্র জানায়, মূলত জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে সরকারি খাস পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য করায় ইয়াছিনের কাজ। এছাড়া পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, দোকানপাট থেকে মাসিক কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাজি করেন ইয়াসিন।

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নব্বই দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি শুরু করেন। দখল ধরে রাখতে গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। এলাকাটি দুর্গম পাহাড়ে হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে যেতে পারতেন না। এই সুযোগে নিম্ন আয়ের লোকজনের কাছে পাহাড়ি খাস জায়গা বিক্রি শুরু করে আক্কাসের বাহিনী। শুরুতে দুই শতক জায়গা বিক্রি হতো ২০ হাজার টাকায়। নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এসব জায়গা কেনাবেচা চলে আসছে। প্লট গ্রহীতাদের ছিন্নমূল সমবায় সমিতি নামক সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত করে বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানা সেবা দেওয়ার কথা বলে নিয়মিত চাঁদা আদায় শুরু হয়। জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশ মুখে নির্মাণ করা হয় একাধিক লোহার গেট। পরিচয়পত্র ছাড়া কেউ গেট অতিক্রম করতে পারতেন না। প্লট বিক্রির টাকা ও পাহাড় দখল নিয়ে এক সময় বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। এর মধ্যেই র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান আক্কাস। এর কিছুদিন পর আক্কাসের সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা আলাদা দল তৈরি করেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইয়াসিন সীতাকুণ্ডের এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। আল মামুন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা। ইয়াসিন এলাকার আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন কাজী মশিউর, গাজী সাদেক। যারা প্লট কিনেছেন তারাই এ দুই সমিতির সদস্য। বর্তমানে এ দুটি সমিতিতে প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছেন।

গত ২ জানুয়ারি সলিমপুরে খুন হন ইউনিয়ন শ্রমিক দলের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি মীর আরমান। তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়। গত ১৪ মাসে এলাকাটিতে চারজন খুন হয়েছেন। পুলিশ বলছে, সব কটি খুনের পেছনে রয়েছে পাহাড়ি এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বজায় রাখা।

এলাকার বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিনকে সরিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরের দখল নিতে গত বছরের ৫ আগস্টের পর হামলা চালায় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত) রোকন উদ্দিনের বাহিনী। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন কাজী মশিউর, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুর। কিন্তু ইয়াসিন বাহিনীর সঙ্গে তাঁরা পেরে উঠে না। কাজী মশিউররা রয়েছেন জঙ্গল সলিমপুরের সলিমপুর অংশে আর ইয়াসিন রয়েছেন আলীনগরে।

আলীনগরের স্বঘোষিত রাজা ইয়াসিন

জীবিকার সন্ধানে নোয়াখালী থেকে কয়েক বছর আগে ছোট ভাই ফারুকসহ চট্টগ্রামে আসেন ইয়াসিন। এসে প্রথমে কিছুদিন চট্টগ্রাম শহরে সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন। থাকতেন চট্টগ্রাম নগরের একটি বস্তিতে। এরপর কিছুদিন চাকরি নেন একটি জুট মিলে। আরও কিছুদিন পর সীতাকুণ্ডের সলিমপুরের জঙ্গল সলিমপুরে একটি ঘর ভাড়া নেন। সেখানে নোয়াখালী থেকে কিছু সন্ত্রাসী এনে রাখতেন। এরপর পার্শ্ববর্তী দুর্গম পাহাড়ের একটি অংশ কেটে বিক্রি করা শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও সন্ত্রাসী ও দাগি আসামিদের সেখানে নিয়ে আসেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। শুরু করেন দেদারসে পাহাড় কাটা। পাহাড় কেটে একদিকে মাটি এবং অন্যদিকে জায়গা বিক্রি করতেন। ফলে রাতারাতি দুই ভাই কোটিপতি বনে যান। বিশাল একটি এলাকার নাম দেন ‘আলীনগর’। বাংলাদেশ থেকে করে নেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

‘আলীনগর’ বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থান করলেও দেশের কোনো আইনই সেখানে কার্যকর ছিল না। সেখানকার অধিবাসীরা চলত রাজা ইয়াসিনের নিজস্ব আইনে। আলীনগরের প্রবেশের তিনটি পথ ছিল। তিনটি পথেই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতেন তার নিজস্ব সিকিউরিটির সদস্যরা। বাইরের কোনো লোক ভেতরে প্রবেশ করতে পারতেন না। আবার ভেতর থেকেও কেউ বাইরে যেতে পারতেন না, যতক্ষণ না রাজার অনুমতি পেতেন।

বসবাসকারীদের কোনো অতিথি আসলে তাদের ভোটার আইডি কার্ড অথবা জন্মনিবন্ধন কার্ড নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। সঙ্গে আনা অ্যান্ড্রয়েড ফোনও জমা দিতে হতো। এখানে বসবাসকারীদের কেউই অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারতেন না। আর যারা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা—অর্থাৎ যারা জায়গা কিনে বসবাস করছেন—তাদের ইয়াসিনের স্বাক্ষর করা বিশেষ পাস দেওয়া হতো। সেই পাস দেখিয়ে তারা ভেতর থেকে বাইরে ও বাইরে থেকে ভেতরে প্রবেশ করতে পারতেন। এই রাজ্যের কেউ কখনো থানা বা অন্য কোথাও কোনো অভিযোগ নিয়ে যেতে পারতেন না। অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, বিচার হতো ইয়াসিনের আদালতে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি অবস্থিত। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ডে এটির অবস্থান হলেও এটি অনেকটা নগরের ভেতরেই। এর পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা। লিংক রোডসংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় বছরের পর বছর ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলমান রয়েছে।

এদিকে নিহত র‌্যাব কর্মকর্তা নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার জানাজা মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র‌্যাব-৭-এর প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এতে র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জানাজা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) একেএম শহিদুর রহমান কথা বলেন। সেখানে তিনি জঙ্গল সলিমপুর থেকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যে কোনো মূল্যে উচ্ছেদের ঘোষণা দেন।

র‌্যাব ডিজি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর একটি সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। খুব শিগগিরই আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেখানে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে এবং যারা অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, তাদের নির্মূল করা হবে। অবৈধ কর্মকাণ্ডের এই আস্তানা আমরা ভেঙে-চুরে গুঁড়িয়ে দেব—এইটুকু কথা আপনাদের দিতে চাই।

হামলায় নিহত র‌্যাব সদস্যকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে একেএম শহিদুর রহমান বলেন, সুবেদার মোতালেব শহীদ হয়েছেন। যারা এ ঘটনার জন্য দায়ী, তাদের আমরা অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসব। বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে যেন তাদের শাস্তি নিশ্চিত হয়, সেটি যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

এমকে/আরটিএনএন