বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের শীর্ষে ‘অ্যাকিউজড’।
বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের শীর্ষে ‘অ্যাকিউজড’।   ছবি: সংগৃহীত

২৭ ফেব্রুয়ারি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে অনুভূতি কশ্যপ পরিচালিত ওয়েব সিনেমা ‘অ্যাকিউজড’। সমালোচকদের কাছ থেকে খুব বেশি প্রশংসা না পেলেও সাধারণ দর্শকের আগ্রহে বর্তমানে বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের টপ চার্টের শীর্ষে রয়েছে ছবিটি।

চলচ্চিত্রটির গল্প গড়ে উঠেছে গীতিকা (কঙ্কণা সেন শর্মা) ও মীরা (প্রতিভা রান্তা) নামের দুই চরিত্রকে ঘিরে। গীতিকা একজন খ্যাতিমান সার্জন, যিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে কর্মরত। আত্মবিশ্বাসী ও পেশাগতভাবে সফল এই চিকিৎসকের জীবনে সবকিছুই যেন ঠিক পথে এগোচ্ছিল—সামনে বড় পদোন্নতি, নতুন শহরে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং ব্যক্তিগত জীবনেও স্থিতিশীল সম্পর্ক।

কিন্তু হঠাৎ একটি অজ্ঞাত ই-মেইল তাঁর জীবন ওলটপালট করে দেয়। এক রোগী অভিযোগ করেন, গীতিকা ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁকে যৌন হয়রানি করেছেন। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর শুরু হয় প্রশ্ন, সন্দেহ ও সামাজিক বিচারের এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া। সহকর্মীদের আচরণ বদলে যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা, এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ মানুষদের মনেও জন্ম নেয় সন্দেহ।

নারী ক্ষমতা, অভিযোগের রাজনীতি ও সামাজিক পূর্বধারণাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘অ্যাকিউজড’। ‘মি টু’ আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা, নৈতিকতা ও অভিযোগের জটিলতা নিয়ে একটি সামাজিক থ্রিলার নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে ছবিটিতে।

দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া লিখেছে, ছবিটি শুরু থেকেই দর্শককে দ্বিধায় রাখে—গীতিকা কি সত্যিই অপরাধী, নাকি তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার? পরিচালক এমনভাবে গল্প সাজিয়েছেন, যাতে প্রায় প্রতিটি চরিত্রকেই সম্ভাব্য অভিযুক্ত মনে হয়। গীতিকার অতীত, তাঁর আচরণ ও পেশাগত সম্পর্ক—সবকিছুই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

চলচ্চিত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। পুরুষশাসিত পেশায় দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে গীতিকার ব্যক্তিত্ব অনেকটাই কঠোর হয়ে উঠেছে। ছবিটি দেখাতে চায়, ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে টিকে থাকতে গিয়ে অনেক সময় নারীরাও সেই একই কাঠামোর প্রতিরূপ হয়ে ওঠেন।

চলচ্চিত্রটি আরেকটি জটিল প্রশ্ন তোলে—যদি ক্ষমতার অপব্যবহারকারী একজন নারী হন? ‘মি টু’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এমন গল্প বলা ঝুঁকিপূর্ণ। সমালোচকদের মতে, ছবিটি এই ঝুঁকি নিলেও শেষ পর্যন্ত সেই জটিলতা পুরোপুরি সামলাতে পারেনি।

গল্পের শুরুতে অন্ধকার লাইব্রেরিতে বসে অজ্ঞাত কেউ অভিযোগপত্র লিখছে—এমন দৃশ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে রহস্যের আবহ। এরপর ধীরে ধীরে সামনে আসে বিভিন্ন চরিত্র—সহকর্মী, পুরোনো সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের মানুষজন। ফলে গল্পটি অনেকটা রহস্য অনুসন্ধানের আকার নেয়।

তবে শেষ পর্যন্ত রহস্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় অভিযোগ ওঠার পর একজন মানুষের মানসিক ভাঙন। গীতিকার সামাজিক পরিচয়—একজন দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী ও সমকামী নারী—পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি কঙ্কণা সেন শর্মা। সমালোচকদের মতে, গীতিকার আত্মবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব ও ভেঙে পড়ার মুহূর্তগুলো তিনি দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে চিত্রনাট্যের সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর অভিনয়ও অনেক সময় পূর্ণ শক্তিতে বিকশিত হতে পারেনি।

মীরার চরিত্রে প্রতিভা রান্তা গীতিকার ব্যক্তিগত জীবনের সংকটকে সামনে এনেছেন। বিশ্বাস ও সন্দেহের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের মানসিক টানাপোড়েন তিনি সংযত অভিনয়ে তুলে ধরেছেন।

ফিল্মফেয়ার লিখেছে, কঙ্কণা সেন শর্মা গীতিকার চরিত্রটিকে নানা বৈপরীত্যে গড়ে তুলেছেন—তিনি কর্তৃত্বপরায়ণ, কঠোর এবং প্রায় পারফেকশনিস্ট। চরিত্রটির ভেতরের ভয় ও মানবিক ভঙ্গুরতাকে তিনি সূক্ষ্ম অভিনয়ে প্রকাশ করেছেন।

দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়ার মতে, ছবির নির্মাণশৈলীতে কিছু অসংগতি রয়েছে। সামাজিক বাস্তবতার গল্প হলেও অনেক দৃশ্যে অতিরিক্ত থ্রিলারের আবহ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। দ্রুতগতির পটভূমি সংগীত ও নাটকীয় দৃশ্যায়ন অনেক সময় ছবির মূল বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না। এ ছাড়া সংলাপ ও ডাবিংয়ের কিছু প্রযুক্তিগত দুর্বলতাও দর্শকের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

দ্য হিন্দু লিখেছে, ছবিটি শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্ন তুলেই যেন থেমে যায়—অভিযোগের যুগে আমরা কাকে বিশ্বাস করব, আর কাকে সন্দেহ করব? সেই উত্তর খোঁজার দায় দর্শকের ওপরই ছেড়ে দেয় ‘অ্যাকিউজড’