ডোনাল্ড ট্রাম্প, গ্রিনল্যান্ড, পুতিন, ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জেনেভায় ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অনুষ্ঠেয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় দফার পরমাণু আলোচনায় তিনি "পরোক্ষভাবে" যুক্ত থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনার আগে বৈঠকের জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যখন সুইজারল্যান্ডের ওই শহরে পৌঁছান, ঠিক তখনই সোমবার ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন।

এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আগে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে তাদের দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরানে কোনো হামলা হলে তা একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা করবে।

এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, মঙ্গলবারের আলোচনাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “আমি ওই আলোচনায় পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকব। আর এই আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “আলোচনার টেবিলে ইরান বেশ কঠিন প্রতিপক্ষ।”

চুক্তির সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, গত জুন মাসে নিজেদের কঠোর অবস্থানের পরিণতি ইরান হাড়েমজ্জায় টের পেয়েছে। সে সময় ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিয়েছিল এবং ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল।

তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা চলাকালেই ওই হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যার ফলে আলোচনা ভেস্তে যায়। তবে এবার তেহরান আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না তারা চুক্তি না হওয়ার ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে চাইবে।”

ইরান চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহী বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মন্তব্য করলেও, এই আলোচনায় বড় ধরনের বাধার আশঙ্কা রয়েছে। ওয়াশিংটন দাবি জানিয়েছে, তেহরানকে তাদের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ত্যাগ করতে হবে এবং তারা আলোচনার পরিধি বাড়িয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মতো পারমাণবিক বহির্ভূত বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে।

অন্যদিকে তেহরান জোর দিয়ে বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশেই পরিচালিত হচ্ছে। তারা জানিয়েছে, একমাত্র নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহারের বিনিময়েই তারা কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘শূন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ’ নীতি তারা মেনে নেবে না এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিষয়টি আলোচনার বাইরে থাকবে।

‘ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তি’

সোমবার জেনেভায় পৌঁছানোর পর আরাঘচি বলেন, “একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত ধারণা” নিয়েই তিনি এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে তিনি লেখেন, “যা আলোচনার টেবিলে নেই তা হলো: হুমকির কাছে নতি স্বীকার।”

ইরানি এই কূটনীতিক জেনেভায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গেও কারিগরি আলোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর জাতিসংঘের এই পর্যবেক্ষক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করেছিল তেহরান।

ইসরায়েল-মার্কিন হামলার পর ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হয়েছে, তা জানাতে আইএইএ গত কয়েক মাস ধরে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। এছাড়া নাতাঞ্জ, ফোর্ডো এবং ইসফাহান—বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এই তিনটি প্রধান স্থাপনাসহ অন্যান্য স্থানে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শনের অনুমতিও চাইছে সংস্থাটি।

যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেখানে আইএইএ-কে কিছুটা প্রবেশের সুযোগ দিলেও, তেজস্ক্রিয়তার সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলে অন্য স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শকদের যেতে দেয়নি তেহরান। তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি রেসুল সেরদার জানান, আলোচনাকে কেন্দ্র করে ইরানের রাজধানীতে “আশাবাদ” লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “এখানকার কর্মকর্তারা বলছেন, জেনেভায় ইরানি প্রতিনিধিদলে পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক, আইনি, রাজনৈতিক এবং কারিগরি টিম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে বড় ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত।”

তবে সেরদার উল্লেখ করেন, এই আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি বলেন, ইরানিরাও “পিছিয়ে নেই”। সোমবার উপসাগরীয় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সামরিক মহড়া শুরু করেছে।

ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে যে, কোনো হামলা হলে প্রতিশোধ হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেল রপ্তানির রুট। এই পদক্ষেপ বিশ্বের তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ আটকে দিতে পারে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী করে তুলতে পারে।

ইরান এও হুমকি দিয়েছে যে, হামলার ঘটনা ঘটলে তারা ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানবে, যা একটি বিস্তৃত যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। সেরদার বলেন, “কূটনৈতিক তৎপরতার সমান্তরালে এই সামরিক উত্তেজনাও চলছে। আঞ্চলিক দেশগুলোও কূটনীতি জোরদার করছে, কারণ তাদের নিজস্ব উদ্বেগ ও ভীতি রয়েছে।”

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই