দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন, ঠিক তখনই জেনেভায় আরেক দফা শান্তি আলোচনার জন্য বসতে যাচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদল।
মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই দুদিনের আলোচনায় মূলত ভূখণ্ড বা সীমানার বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের চতুর্থ বার্ষিকী পূর্ণ হওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগেই এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মস্কো ও কিয়েভ যেন দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছায়, সে জন্য চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প। যদিও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন যে, ছাড় দেওয়ার জন্য তাঁর দেশই ওয়াশিংটনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে। রাশিয়া দাবি করছে, পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্কের যে ২০ শতাংশ এলাকা এখনো মস্কো দখল করতে পারেনি, তা যেন কিয়েভ ছেড়ে দেয়। তবে কিয়েভ এই দাবি মানতে নারাজ।
সোমবার গভীর রাতে ইউক্রেনের ওপর আবারও চাপ বাড়ান ট্রাম্প। এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা অবস্থায় এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি আলোচনাটিকে ‘বিশাল’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “ইউক্রেনের উচিত দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসা।” এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না বলে তিনি শুধু যোগ করেন, “আপাতত আমি এটুকুই বলছি।” ক্রেমলিন জানিয়েছে, গণমাধ্যমের উপস্থিতি ছাড়াই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে চলতি বছর আবুধাবিতে দুই দফা আলোচনা হলেও তাতে কোনো ফল আসেনি।
সোমবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, “এবার মূল বিষয়গুলোসহ আরও বিস্তৃত পরিসরে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের উত্থাপিত দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত ভূখণ্ড এবং অন্যান্য সব বিষয়ই প্রধান আলোচ্যসূচিতে থাকবে।” অন্যদিকে ইউক্রেন বলছে, রাশিয়া কোনো ছাড় দিতে নারাজ এবং তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, “এমনকি জেনেভায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তেও রুশ সেনাবাহিনীর কাছে ইউক্রেনে হামলা চালানো ছাড়া অন্য কোনো নির্দেশ নেই। এতেই বোঝা যায়, অংশীদারদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে রাশিয়া কতটা গুরুত্ব দেয়।” তিনি আরও বলেন, “রাশিয়ার ওপর পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ এবং ইউক্রেনের জন্য স্পষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পেলেই কেবল এই যুদ্ধ বাস্তবে শেষ করা সম্ভব।”
১৯৪৫ সালের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ইউক্রেনের বহু শহর ও গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখন রাশিয়ার দখলে, যার মধ্যে ক্রিমিয়া এবং ২০২২ সালের আগ্রাসনের আগে দখলকৃত পূর্ব দোনবাসের কিছু অংশও রয়েছে। যেকোনো শান্তি চুক্তির শর্ত হিসেবে রাশিয়া চায়, কিয়েভ যেন তাদের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও কৌশলগত এলাকাগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কিয়েভ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এর বদলে পশ্চিমাদের কাছ থেকে জোরালো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দাবি করেছে।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, রুশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সহযোগী ভ্লাদিমির মেদিনস্কি। তবে অতীতে ইউক্রেনীয় আলোচকরা অভিযোগ করেছিলেন যে, মেদিনস্কি আগ্রাসনের অজুহাত হিসেবে তাদের কেবল ইতিহাসের পাঠ দিতে চান। এ কারণে জেনেভায় বড় কোনো সাফল্যের প্রত্যাশা খুব একটা নেই। আলোচনায় সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ইগর কোস্তিউকভও অংশ নেবেন। এছাড়া পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভ অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে গঠিত একটি আলাদা ওয়ার্কিং গ্রুপে থাকবেন।
মস্কোভিত্তিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভ্লাদিমির সত্নিকভ আল জাজিরাকে জানান, রুশ দলে প্রায় ২০ জন সদস্য থাকবেন, যা আগের আলোচনার চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় রাশিয়ার উদ্দেশ্য এবার বেশ সিরিয়াস। কারণ রাশিয়ার সাধারণ মানুষও এই যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।”
কিয়েভের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব রুস্তেম উমেরভ এবং জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ কিরিলো বুদানভ। জ্যেষ্ঠ প্রেসিডেন্সিয়াল সহযোগী সের্গেই কিসলিৎসাও উপস্থিত থাকবেন। জেনেভায় রওনা হওয়ার আগে উমেরভ বলেন, ইউক্রেনের লক্ষ্য "একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি" এবং তা অপরিবর্তিত রয়েছে।
ভূখণ্ড ছাড়াও জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনে পশ্চিমা সেনাদের সম্ভাব্য ভূমিকা কী হবে—এসব ইস্যুতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মতপার্থক্য অনেক। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার আলোচনায় প্রতিনিধিত্ব করবেন। তারা এই সপ্তাহে জেনেভায় ইরানের সঙ্গে বৈঠকেও উপস্থিত থাকছেন।
সূত্র : রয়টার্স
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!