যুক্তরাজ্য, কিয়ার স্টারমার, ডোনাল্ড ট্রাম্প
দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপ ইজারা দেওয়ার চুক্তিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার "বড় ভুল করছেন" বলেছেন ট্রাম্প   ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের চুক্তি অনুমোদন করার একদিন পরই, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন। বুধবার ট্রাম্প বলেন, এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তর এবং দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপটি (যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে) ইজারা দেওয়ার চুক্তিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার "বড় ভুল করছেন"।

ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ লিখেছেন, "দিয়েগো গার্সিয়া হাতছাড়া করবেন না!" তিনি উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে ইরান থেকে সম্ভাব্য কোনো হামলা ঠেকাতে যেকোনো সামরিক অভিযানে এই ঘাঁটিটি প্রয়োজন হতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, "আমি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মারকে বলে আসছি যে, দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ইজারা বা লিজ কোনো ভালো বিষয় নয়। দিয়েগো গার্সিয়ার ওপর যারাই অধিকার, মালিকানা বা স্বার্থ দাবি করছে, তাদের সঙ্গে ১০০ বছরের ইজারা চুক্তিতে গিয়ে তিনি বড় ভুল করছেন।"

ট্রুথ সোশ্যালের ওই পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন, স্টার্মার "অজানা সব সত্তার দাবির মুখে এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন।" তিনি আরও বলেন, "আমাদের মতে, এগুলোর প্রকৃতি কাল্পনিক।" ১৭১৫ থেকে ১৮১০ সাল পর্যন্ত যখন মরিশাস ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জটি মরিশাসের অংশ হিসেবেই শাসিত হতো। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাজ্য উভয় দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ১৯৬৮ সালে মরিশাসকে স্বাধীনতা দেওয়ার আগে চাগোস দ্বীপপুঞ্জকে সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

এরপর দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাজ্য দ্বীপগুলোর বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। ২০১৯ সালে মরিশাস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আইনি লড়াইয়ে জয়লাভ করে এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) যুক্তরাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানায়। এরপর জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবে যুক্তরাজ্যকে ছয় মাসের মধ্যে দ্বীপগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য দিয়েগো গার্সিয়া ৯৯ বছরের জন্য ইজারা নেবে, যা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। এর জন্য বছরে প্রায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড (১৩৫ মিলিয়ন ডলার) খরচ হবে। বুধবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ এবং উন্নয়ন অফিসের একজন মুখপাত্র বলেন, এই চুক্তি "যুক্তরাজ্য এবং আমাদের প্রধান মিত্রদের নিরাপত্তা এবং ব্রিটিশ জনগণকে নিরাপদ রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"

ওই মুখপাত্র আরও বলেন, "আমরা যে চুক্তিতে পৌঁছেছি, তা এই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়।" ট্রাম্পের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে এই চুক্তি নিয়ে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সর্বশেষ সংযোজন।

যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্তের কারণে পূর্বের ব্যবস্থায় ঘাঁটিটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল, তাই তাদের কাছে চুক্তি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। গত বছর ওয়াশিংটন এই চুক্তিতে সম্মতি দিলেও, জানুয়ারিতে ট্রাম্প একে "বড় বোকামি" হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ফেব্রুয়ারির শুরুতে তিনি বলেছিলেন যে স্টার্মারের পক্ষে এটিই হয়তো সেরা চুক্তি ছিল, তবে তিনি যোগ করেছিলেন যে প্রয়োজনে ঘাঁটিটি "সামরিকভাবে সুরক্ষিত" রাখার অধিকার তিনি বজায় রাখবেন।

মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর একটি বিবৃতি জারি করে এই চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, "যুক্তরাষ্ট্র চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে মরিশাসের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের চুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।" একই সঙ্গে আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও মরিশাসের মধ্যে আলোচনার ঘোষণা দেওয়া হয়।

বুধবার ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে আরও সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে তাদের সম্ভাব্য হামলা নস্যাৎ করতে "যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দিয়েগো গার্সিয়া এবং ফেয়ারফোর্ডে অবস্থিত বিমানঘাঁটি ব্যবহার করা প্রয়োজন হতে পারে।" ইজারা চুক্তিকে ঠুনকো হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যকে অবশ্যই "ওকিজম (Wokeism) এবং তাদের সামনে আসা অন্যান্য সমস্যার মুখে শক্ত থাকতে হবে।"

দিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে এবং ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ও আল-কায়েদার বিরুদ্ধে হামলাগুলো দিয়েগো গার্সিয়া থেকেই পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রায় ২,০০০ চাগোসিবাসীকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছিল এবং তাদের মূলত মরিশাস ও যুক্তরাজ্যে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। কিছু চাগোসিবাসী এই চুক্তির সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন যে, মরিশাস দশকের পর দশক ধরে তাদের অবহেলা করেছে। তবে মরিশাস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই