যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার রাতে ইতিহাসের দীর্ঘতম স্টেট অব দ্যা ইউনিয়ন ভাষণ প্রদান করেন। এতে তিনি মার্কিন অর্থনীতি, অপরাধ, বাণিজ্য, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতিসহ তাঁর বিভিন্ন নীতি তুলে ধরেন এবং বলেন, এসব কিছু মিলিয়ে একটি "যুগান্তকারী পরিবর্তন" সাধিত হয়েছে।
তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের এই প্রথম ভাষণটি ১ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট স্থায়ী হয়, যা ২০০০ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ১ ঘণ্টা ২৮ মিনিটের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ভাষণের শুরুতে ট্রাম্প বলেন, "আমাদের জাতি ফিরে এসেছে: আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়, ভালো, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী।"
ভাষণ শেষ করেন একই ধরনের আবেগ নিয়ে: "আমাদের ভবিষ্যৎ হবে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়, ভালো, উজ্জ্বল, সাহসী এবং আরও গৌরবময়।" তবে এই আবেগ ভোটারদের কাছে কতটা অনুরণন তৈরি করবে, তা দেখার বিষয়। কারণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার হার তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে।
এটাও অনিশ্চিত যে, ট্রাম্পের সাফল্যের দাবিগুলো রিপাবলিকান পার্টিকে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় গতি দেবে কিনা — এই নির্বাচনই আগামী বছরগুলোতে তাঁর কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা অনেকটাই নির্ধারণ করবে। ভাষণের কিছু মূল মুহূর্ত তুলে ধরা হলো:
ট্রাম্প বলেন অর্থনীতি 'গর্জে উঠেছে'
ট্রাম্পের ভাষণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মার্কিন অর্থনীতিতে তাঁর নেতৃত্বের সাফল্য তুলে ধরা — যদিও গত ১৩ মাসে অর্থনীতির চিত্র মিশ্র ছিল। ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিটের ধারাবাহিক শক্তি ও কর্মসংস্থানের শক্তিশালী পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করেন, তবে ২০২৫ সালে প্রত্যাশার চেয়ে ধীর প্রবৃদ্ধির বিষয়টি এড়িয়ে যান।
মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমলেও, ট্রাম্প যেমন বললেন ঠিক সেভাবে "ধস নামেনি"। যেমন, ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের জানুয়ারির তথ্য দেখাচ্ছে, খাদ্যমূল্য এখনো গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৯ শতাংশ বেশি। এরপর প্রেসিডেন্ট "সাশ্রয়যোগ্যতা" বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রসঙ্গে আসেন, যা তাঁর জন্য একটি কঠিন বিষয় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, অর্থনীতিতে ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমেছে, কারণ অনেক মার্কিন নাগরিক এখনও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে জর্জরিত।
ট্রাম্প এই সমস্যার জন্য মূলত ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করেন, বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে, যাঁর মেয়াদ ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরেরও আগে শেষ হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, "তাদের নীতিই উচ্চমূল্য তৈরি করেছে; আমাদের নীতি দ্রুত সেগুলোর অবসান ঘটাচ্ছে।"
ট্রাম্প তাঁর 'ট্রাম্পআরএক্স' ওয়েবসাইটেরও প্রশংসা করেন, যেখানে বিমাবিহীন মানুষ অনলাইনে সম্ভাব্য সস্তায় ওষুধ কিনতে পারেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডেটা সেন্টারের চাহিদা সত্ত্বেও ইউটিলিটি বিল কম রাখতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছেন তিনি। এছাড়া ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণহারে একক পরিবারের বাড়ি কেনা থেকে বিরত রাখতে একটি নির্বাহী আদেশের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
শুল্ক রায়ের পরও অনড় প্রেসিডেন্ট
গত সপ্তাহে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, ট্রাম্প গত বছর ঘোষিত পাল্টা শুল্কের বড় অংশ বেআইনি। ট্রাম্পের যেকোনো নীতির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের এটিই সবচেয়ে বড় ধাক্কা। তবে ট্রাম্প অটল রয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, "মাত্র চার দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি দুর্ভাগ্যজনক রায় এসেছে; অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক রায়।"
চেম্বারে প্রবেশের সময় তিনি উপস্থিত চারজন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতিকে অভিবাদন জানান, যাদের মধ্যে তাঁর নিযুক্ত নিল গোরসাচ ও অ্যামি কোনি ব্যারেটও ছিলেন। মঙ্গলবার, ট্রাম্প যাকে "সম্পূর্ণ অনুমোদিত ও পরীক্ষিত বিকল্প আইনি ধারা" বলে বর্ণনা করেন, তার আওতায় ১০ শতাংশ হারে নতুন বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর হয়। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এটি ১৫ শতাংশে বাড়াতে চান। তিনি আরও বলেন, শুল্ক বহাল রাখতে "কংগ্রেসের কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে না।"
অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবাদ
ট্রাম্প তাঁর কঠোর অভিবাসন নীতির ওপর ব্যাপক জোর দেন, বিশেষ করে মার্কিন সীমান্ত বন্ধ করার বিষয়ে। তিনি বারবার অভিবাসনকে অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেন, যদিও গবেষণায় দেখা গেছে অভিবাসীরা মার্কিন নাগরিকদের তুলনায় কম হারে অপরাধ করে। ট্রাম্প আবারও সোমালি-আমেরিকান সম্প্রদায়ে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন এবং "মিনেসোটায় লুটপাট চালানো সোমালি জলদস্যুদের" কথা উল্লেখ করেন। ট্রাম্প উপস্থিতদের দাঁড়াতে বলেন, যদি তারা একমত হন যে "মার্কিন সরকারের প্রথম কর্তব্য মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা, অবৈধ অভিবাসীদের নয়।"
এতে সোমালি বংশোদ্ভূত আমেরিকান ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর এবং ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমেরিকান রাশিদা তালিব চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান। মিনেসোটা রাজ্যের একটি জেলার প্রতিনিধি ওমর — যেখানে জানুয়ারিতে অভিবাসন এজেন্টদের হাতে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হন — চিৎকার করে বলেন, "আপনি আমেরিকানদের হত্যা করেছেন।"
এর আগে সন্ধ্যায়, প্রতিনিধি অ্যাল গ্রিনকে চেম্বার থেকে বের করে দেওয়া হয়, যখন তিনি একটি প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন — যেটি ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা একটি বর্ণবাদী ভিডিওর প্রসঙ্গে ছিল, যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তাঁর স্ত্রী মিশেলকে বানর হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল।
অর্থনীতি ও অভিবাসনের নীতিগত যুক্তির বাইরে, ট্রাম্প কংগ্রেসে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণের পক্ষে চরম দলীয় আবেদন রাখেন। তিনি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে একটি "উদ্ধার অভিযান" হিসেবে তুলে ধরেন; ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের "পাগল" বলে আখ্যায়িত করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে "দেশ ধ্বংস করার" অভিযোগ এনে দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন "ঠিক শেষ মুহূর্তে" হস্তক্ষেপ করেছে। পুরো ভাষণ জুড়ে তিনি বারবার তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের জাতীয় স্বার্থবিরোধী দেশদ্রোহী শক্তি হিসেবে চিত্রিত করেন।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না
২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার বিষয়ে কথা বলেন। মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে "এক সপ্তাহ দূরে" থাকতে পারে বলে মন্তব্য করার মাত্র কয়েক দিন পরই ট্রাম্প আবারও দাবি করেন যে, গত বছর মার্কিন হামলা "ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে"।
ইরানে চলমান বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের মধ্যে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বাড়িয়েছেন, যদিও তিনি বলেন কূটনৈতিক সমাধানকেই প্রাধান্য দিতে চান। ট্রাম্প বলেন, "আমরা সেই গোপন কথাগুলো এখনও শুনিনি: 'আমরা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র বানাব না'।"
ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাগচি এক্স-এ পোস্ট করে লেখেন, "ইরান কোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।" ইরানি কর্মকর্তারা বারবার পারমাণবিক অস্ত্রের সন্ধানের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান "এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে কাজ করছে যা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারবে।"
টেলিভিশনের জন্য তৈরি মুহূর্ত
ট্রাম্প রিয়ালিটি টেলিভিশনে তাঁর কেরিয়ার গড়ে তুলেছিলেন এবং ক্যামেরার জন্য উপযুক্ত মুহূর্ত সৃষ্টিতে তাঁর দক্ষতা এই ভাষণেও স্পষ্ট ছিল। এক পর্যায়ে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন অপহরণের কথা উল্লেখ করেন, যাকে তিনি "যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল বিজয়" বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র "তাদের নতুন বন্ধু ও অংশীদার ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে ৮ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল পেয়েছে।"
এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভেনেজুয়েলার বিরোধী আইনপ্রণেতা এনরিকে মার্কেজকে পরিচয় করিয়ে দেন, যাঁকে মাদুরোর অপহরণের পরপরই ডেলসি রদ্রিগেজের সরকার কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। ট্রাম্প মার্কেজের ভাগ্নি হিসেবে পরিচিত এক নারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আলেহান্দ্রা, আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে শুধু আপনার চাচা মুক্তি পাননি, বরং তিনি আজ রাতে এখানে আছেন। আমরা তাঁকে এনেছি যেন তিনি আপনার সামনে তাঁর স্বাধীনতা উদযাপন করতে পারেন।"
ট্রাম্প মাদুরো অপহরণ অভিযানে আহত চিফ ওয়ারেন্ট অফিসার এরিক স্লোভারকে কংগ্রেশনাল মেডেল অব অনার প্রদান করেন। এর আগে সন্ধ্যায়, ট্রাম্প মার্কিন পুরুষ হকি দলের গোলরক্ষক কনর হেলবাইককে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম প্রদান করেন। অলিম্পিকে কানাডাকে হারিয়ে স্বর্ণজয়ী এই দলটিকে ট্রাম্প তাঁর অতিথি হিসেবে ভাষণে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক্রিয়া
কয়েক ডজন ডেমোক্র্যাট ট্রাম্পের ভাষণ বয়কট করে বিকল্প অনুষ্ঠানে যোগ দেন। দলটির আনুষ্ঠানিক জবাব দেন ভার্জিনিয়ার গভর্নর অ্যাবিগেল স্প্যানবার্গার। স্প্যানবার্গার বলেন, ট্রাম্পের শুল্কের কারণে মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, গণহারে বহিষ্কার অভিযানের ভারে সম্প্রদায়গুলো পিষ্ট হচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সমস্যা এখনও নাগরিকদের পিছু ছাড়ছে না।
তিনি বলেন, "আমেরিকানরা, আপনারা যারা ঘরে বসে দেখছেন, জানেন যে আপনারা আরও বেশি দাবি করতে পারেন এবং আমরা খরচ কমাতে কাজ করছি। আমরা আমাদের সম্প্রদায় ও দেশকে নিরাপদ রাখতে কাজ করছি, এবং আমরা আপনাদের জন্যই কাজ করছি।"
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!